Friday , 2 October 2026
minar

ইতিহাস-ঐতিহ্যে দেশের ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানগুলোর অন্যতম হাজীগঞ্জ ঐতিহাসিক বড় মসজিদ কমপ্লেক্স-৪র্থ পর্ব

চাঁদপুর জেলার ঐতিহ্যবাহী জনপদের নাম হাজীগঞ্জ। এখানকার জনগোষ্ঠীর সিংহভাগ বর্তমানে মুসলমান। নদীমাতৃক পলিমাটির নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক সৌন্দর্য চারপাশ থেকে ঘিরে রেখেছে হাজীগঞ্জ জনপদ। হাজীগঞ্জ উপজেলার অন্যতম প্রধান স্থাপত্য নিদর্শন হাজীগঞ্জ ঐতিহাসিক বড় মসজিদ।

এটি বাংলাদেশ সরকারের ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন,বাংলাদেশ ওয়াকফ প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণাধীন, আহমাদ আলী পাটওয়ারী ওয়াকফ এস্টেটের ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান। কালের বিবর্তনে মসজিদটি ইতিহাসের পাতায় স্থান করে নিয়েছে।চাঁদপুর জেলাবাসীর প্রাণপ্রিয় এবং প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশের এ গৌরবােজ্জ্বল ও অনন্য প্রতিষ্ঠানটি আল্লাহর অলীগণের রুহানী ফয়েজ ও বরকতে শিরক-বিদাত মুক্ত ‘এবাদতের মারকাজ’ হিসেবে খ্যাত।

হাজীগঞ্জ ঐতিহাসিক বড় মসজিদের কারামত, ও ফয়েজ-বরকতে ‘পূণ্যভূমি হাজীগঞ্জ’ আজ ধন্য এবং গৌরবান্বিত। তাছাড়াও উক্ত প্রতিষ্ঠানে ধর্মীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ এবং ইতিহাস প্রসিদ্ধ আরও অন্যান্য ব্যক্তিবর্গ শুভাগমন করেছেন। একজন সাধারণ ব্যবসায়ী তাঁর নিজের সম্পদ-সম্পত্তি, মেধা-প্রজ্ঞা দিয়ে আখেরাতকে পাওয়ার আশায় তৎসময়ে পূর্ব বাংলার মুসলমান জনসংখ্যার তুলনায় বিশাল আয়তনের মসজিদ নির্মাণ করে এক ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। আল্লাহ প্রেমের প্রদিপ্ত শিখায় নিবেদিত প্রাণ বান্দাদের জন্য যুগ যুগ ধরে প্রেরণার উৎস হয়ে থাকবেন আহমাদ আলী পাটওয়ারী (রহ:)।

তথ্য কণিকা তয় পর্ব : মৃত্যুর সময় আহমাদ আলী পাটওয়ারী (রহ.)’র খাটের পশ্চিম দিকের খাট থেকে তাঁর সাথের সেবা এবং প্রহরারত জীন অতি বেগে ঝাঁকুনি দিয়ে চলে যায়। তিনি অসুস্থ্য অবস্থায় কি পথ্য খেতে পারবেন বা কি খেলে একটু ভাল লাগবে রাতের বেলায় জ্বীন সেটাও তাঁকে অবহিত করতেন বলে জানা যায় ।

মৃত্যুর পর হাজী আহমাদ আলী পাটওয়ারী (রহ.) কে মসজিদের দক্ষিণ পার্শ্বে অবস্থিত পানির ট্যাংকের দক্ষিণ পার্শে সমাহিত করা হয়। প্রতিদিন অনেক মরমী ব্যক্তি তাঁর মাজার জিয়ারত করে থাকেন এবং তাঁর রুহের মাগফেরাত কামনা করেন। হাজীগঞ্জ বড় মসজিদের ওয়াকিফ হাজী আহমাদ আলী পাটওয়ারী (রহ.) ছিলেন বিরল ব্যক্তিত্বসম্পন্ন আল্লাহভীরু, নিবেদিতপ্রাণ এবং অক্লান্ত এক কর্মবীর। ব্যক্তিগত জীবনে প্রাথমিক পর্যায়ের ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক অন্য শিক্ষার সুযােগ না হলেও প্রকৃতগতভাবে তিনি ছিলেন তীক্ষবুদ্ধির অধিকারী ও উদারপ্রাণ দূরদৃষ্টি সম্পন্ন মানুষ। হাজী আহমাদ আলী পাটওয়ারী (রহ.) প্রতিদিন মধুর সুরে শুদ্ধরূপে পবিত্র । কালামেপাক তিলাওয়াত করতেন।

হাজী আহমাদ আলী পাটওয়ারী (রহ.) ব্যক্তিগত জীবনে ছিলেন চিন্তাশীল, দূরদর্শী ও স্বল্পভাষী। পারিবারিক জীবনে ছিলেন অত্যন্ত স্নেহবৎসল ও সহানুভুতিশীল। সকলের সাথে তার ব্যবহারে ছিল অমায়িক। মহামনীষীদের জীবন চরিত শ্রবণে তিনি সর্বদা আনন্দ পেতেন। তাঁর পােষাক পরিচ্ছদ ছিল অতি সাদাসিদে। শীত, গ্রীষ্ম কিংবা বর্ষা সকল ঋতুতে তিনি মসজিদে জামাতের সাথে নামাজ আদায় করতেন। মনাই হাজী (রহ.)’র ব্যবসায়ীক ঐতিহ্যের উত্তরাধিকারের ধারায় আহমাদ আলী পাটওয়ারী (রহ.) বিভিন্নমুখী ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছিলন। তিনিই ছিলেন হাজীগঞ্জ বাজারের প্রথম কাঠ ব্যবসায়ী এবং বার্মা থেকে আমদানিকৃত কাঠের আড়ৎদার।

বার্মা থেকে আমদানিকৃত কেরােসিন তেলের প্রথম এজেন্সি, তাঁর স্থাপিত মােমবাতি ফ্যাক্টরি, জেনারেটরের বিরাট ইঞ্জিন বসিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহের ব্যবস্থা, ধান ছাটাইয়ের কল প্রভৃতি অত্র এলাকায় জনমনে বিস্ময়ের সৃষ্টি করেছিল। নতুনত্যের প্রতি তার আগ্রহ ছিল প্রবল এবং তিনি নতুন নতুন কর্মের উদ্যোক্তা ছিলেন। বিশাল সম্পদের অধিকারী হওয়া সত্বেও বিলাসিতা হাজী আহমাদ আলী পাটওয়ারী (রহ.)কে স্পর্শ করতে পারেনি। কোনাে সময় তাকে অট্টহাসি করতে দেখা যায়নি। তাঁর একমাত্র চিন্তা ও ধ্যান-ধারণা ছিল স্বপ্নের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন অর্থাৎ মসজিদ সাজানাে ও মুসল্লিদের আরাম আয়েশের ব্যবস্থা করা।

হাজী আহমাদ আলী পাটওয়ারী (রহ.) শীতের মৌসুমে মুসল্লিদের জন্য গরম পানি দ্বারা অজুর ব্যবস্থা করেছিলেন। ব্যাটারীর সাহায্যে মাইকে আজানের ব্যবস্থা চালু করেন। সে সময় এতদঞ্চলে বিদ্যুতের কোনো ব্যবস্থা না থাকায় কপি, বাতি, মোমবাতি, হারিকেন এবং হ্যাজাক লাইট এর স্থলে অত্যাধুনিক আলাের ব্যবস্থা হিসেবে বৈদ্যুতিক লাইটের জন্য আধুনিক জেনারেটর ক্রয় করে লাইট জ্বালিয়ে বিস্ময়ের সৃষ্টি করেন। স্থায়ী ভাবে জেনারেটরের সাহায্যে মসজিদে আলো, বৈদ্যুতিক পাখা সংযােজন করে বাতাসের ব্যবস্থা চালু করেছিলেন। সুদূর আরব দেশ হতে সাইরেন এনে রমজান মাসে সেহরী ও ইফতারের সময় সাইরেন বাজানাের ব্যবস্থা চালু করে সর্ব সাধারণকে অবাক করেছেন।

আহমাদ আলী পাটওয়ারী (রহ.)’র প্রতিষ্ঠিত বিরল কারুকার্য খচিত ও কর্মকুশলতার অনন্য নিদর্শন হাজীগঞ্জ ঐতিহাসিক বড় মসজিদটি উপমহাদেশে ‘জুমাতুল বিদা নামাজের বৃহত্তম জামাতের স্থান হিসেবে খ্যাত হয়ে ওঠে। রহমত ও কারামতপূর্ণ এ মসজিদে রমজান মাসের শেষ জুময়ার নামাজ উপলক্ষে উপমহাদেশের বৃহত্তম জুময়ার জামাতে শরীক হওয়ার জন্য অসংখ্য মুসল্লি সমাগত হয়। জুমাতুল বিদা’র দিন মসজিদের ছাদ, সামনের মাঠ, বাজারস্থ দোকানঘর ও দালানের ছাদসমূহ এমনকি সিএন্ডবি রাস্তাসহকারে সারা বাজার নামাজের স্থানে পরিণত হয়ে যায়।

ধর্মীয় দিবসে ইবাদতে বিপুল সংখ্যক মুসল্লি সমবেত হন এবং প্রতি বৎসর যথাযােগ্য মর্যাদার সহিত পবিত্র মিলাদুন্নবী (সা.) মাহফিলসহ ধর্মীয় আরও অনেক কার্যক্রম অনুষ্ঠিত হয়। সমবেত হাজার হাজার মুসল্লির সমাবেশে বরেণ্য ও প্রখ্যাত ওলামায়ে কেরাম এবং মুফাস্সীরে কেরাম ওয়াজ নসিহত করে থাকেন। এ মসজিদকে কেন্দ্র করে তকালীন পূর্ব এবং পশ্চিম পাকিস্তানের শাসন ব্যবস্থা কোন ভিত্তিতে পরিচালিত হবে ।

সে লক্ষ্যে রাজনৈতিক কর্মসূচী গৃহিত হয়েছিল অর্থাৎ- পাকিস্তান গঠিত হওয়ার পর শরীয়াভিত্তিক শাসন ব্যবস্থা প্রবর্তনের দাবিতে হাজীগঞ্জ বড় মসজিদ প্রাঙ্গণে এক বিরাট ইসলামী সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। মূল সম্মেলনের সভাপতি ছিলেন আল্লামা মওলানা হাকীম আব্দুর রউফ দানাপুরী সাহেব। বিভিন্ন শাখার সভাপতি থাকেন মাও. জাফর আহমাদ ওসমানী থানভী (রহ.), মাও. আব্দুল হাই কোরাইশী (রহ.) ছারছীনা, মাও. আবু জাফর ছিদ্দিকী (রহ.) আল-কোরাইশী ফুরফুরা শরীফ, যোগাযােগ সচিব থাকেন মওলানা হাতেম আলী (রহ.) নোায়াখালী।

এ সম্মেলনে এন্তেজামিয়া কমিটির সভাপতি ছিলেন রূপসার জমিদার সৈয়দ আবদার রশিদ সাহেব। সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন মরহুম খান সাহেব আমিন মিয়া। পাক ভারতের খ্যতনামা ওলামায়ে কেরাম এ সম্মেলনে হাজীগঞ্জ বড় মসজিদে আগমন করেছিলেন। সম্মেলন সাত দিন পর্যন্ত স্থায়ী হয়েছিল।

সভাপতি আল্লামা মওলানা হাকিম মাে.আব্দুর রউফ দানাপুরী (রহ.)’র কর্তৃক উপস্থাপিত সিদ্ধান্ত সম্বলিত সুদীর্ঘ ভাষণের অনুলীপি পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট কায়েদে আজম মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর নিকট প্রেরণ করা হয়েছিল। খান সাহেব আমিন মিয়া হাজীগঞ্জ ইউনিয়ন বাের্ডের চেয়ারম্যান ছিলেন। শেষ জীবনে তিনি হাজিগঞ্জ বড় মসজিদে শীত মৌসুমে মওলানা ইমামুদ্দিন নূরীর ওয়াজ শােনার জন্য রাত্রে দীর্ঘ সময় পর্যন্ত একটি খুঁটিতে হেলান দিয়ে বসে অত্যন্ত কষ্ট সহকারে ওয়াজ শােনেন এবং এক পর্যায়ে অসুস্থ্য হয়ে পড়েন। সে অসুস্থ্যতায় তিনি অল্প দিন পর ইহলােক ত্যাগ করেন (ইন্নলিল্লাহিৃৃৃৃৃ রাজেউন)। আল্লাহ কে উত্তম পুরস্কার দান করুন।

১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধকালীন সময় বড় মসজিদের পেশ ইমাম হাফেজ মওলানা সামছুল হুদা সাহেব মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেন। ইমামতীর পদ শূন্য হল । এমতাবস্থায় পাক বাহিনীর ৩০ পাঞ্জাব রেজিমেন্টের হাবিলদার বশিরের মাধ্যমে আহমাদ আলী পাটওয়ারী (রহঃ)’র বংশধরের বর্তমান মোতাওয়াল্লী ড.আলমগীর কবির পাটওয়ারীসহ ১১ জনকে প্রথমে ডাক বাংলায়, পরে হাজীগঞ্জ থানায় আটক করে রাখা হয়েছিল।

যুদ্ধকালীন সময় আবু নছর আবেদশাহকে ইমাম হিসেবে চাকুরী দেয়ার শর্তে মোতাওয়াল্লী মনিরুজ্জামান পাটওয়ারী সাহেব রাজি হতে বাধ্য হন মর্মে তাদেরকে ছেড়ে দেয়া হয়।

মুক্তিযুদ্ধকালীন সময় তিনি ইমামতী করেন। বড় মসজিদে আগমন উপলেক্ষে মসজিদের মেহমানখানায় বৃটিশ ও পাকিস্তান আমলের অনেক স্বনামধন্য রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব অবস্থান করেছেন। তাঁদের মধ্যে অবিভক্ত বাংলার তৎকালীন মূখ্যমন্ত্রী শেরে বাংলা এ.কে. ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, হযরত মাও.মোহাম্মাদুল্লাহ হাফেজ্জী হুজুর,মজলুম জননেতা মাও. আব্দুল হামিদ খান ভাসানী ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রমুখের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযােগ্য।

বিভিন্ন সময়ে হাজীগঞ্জ বড় মসজিদে উপমহাদেশের আরও অনেক বিখ্যাত ওলামায়ে কেরাম, অলীয়ে কামেল ও বুজুর্গব্যক্তি আগমন করেছিলেন। তাদের মধ্যে উল্লেখযােগ্য হলেন হযরত মাওলানা কারামত আলী জৈনপুরী (রহ.)’র উত্তরসূরীদের মধ্যে মাওলানা হাফেজ আহমাদ, মাও.আব্দুল আউয়াল,হাফেজ আব্দুর রব, হযরত মাও.অজিউল্লাহ সন্দ্বীপী, হযরত মাও. হামেদ আলী ইবনে মাও.কারামত আলী জৈনপুরী (রহ.), হযরত মাও. আবু জাফর ওজীহ ছিদ্দিকী কোরাইশি, আবু জাফর মো. সালেহ শর্ষিনা, হাফেজ সৈয়দ আব্দুল করিম মাদানী, হযরত মাও. সহুল (রহ.) কানপুরী, হযরত মাও.আব্দুল লতিফ (রহ.) মীরসরাই, হযরত মাও.আতহার আলী, নাছিরাবাদ শরীফের হযরত মাও. আবু বকর ছিদ্দিকী (রহ.) ফুরফুরা শরীফ। মাও. হোসাইন আহমাদ মাদানী (রহ.), মাও.জাফর আহমাদ ওসমানী (রহ.), হযরত মাও. এহতেসামুল হক থানভী (রহ.), হাফেজে হাদীস হযরত মাও. রুহুল আমিন ২৪ পরগণা, হযরত মাও. আব্দুর রউফ দানাপুরী, হযরত মাও. হাফেজ আহমাদ জৈনপুরী (রহ.), হযরত মাও. আব্দুল হাই ছিদ্দিকী (রহ.), হযরত মাও. নেছারউদ্দিন (রহ.),হযরত মাও. তাজুল ইসলাম ফখরে বাঙ্গাল, হযরত মাও. আবুল আনছার মো.আব্দুল কাহহার ছিদ্দিকী আল কোরাইশী ফুরফুরা শরীফ এবং আলহাজ্ব হযরত মাও. আব্দুল জাব্বার বায়তুশ শরীফ প্রমুখ।

ঐতিহাসিক এ মসজিদের পাশে এক মুখরিত পরিবেশে চালু রয়েছে দারুল উলুম আহমাদিয়া কামিল মাদ্রাসা,জামিয়া আহমাদিয়া কাওমী মাদ্রাসা, হাফেজিয়া মাদ্রাসা, নূরানী মাদ্রাসা, ফোরকানিয়া মাদ্রাসা।

এছাড়া দুস্থ ও অসহায়দের সহযােগিতা প্রদানসহ ধর্মীয় নানা কার্যাবলীও সম্পাদিত হয়ে আসছে। মনিরুজ্জামান পাটওয়ারী (রহ.) : আহমাদ আলী পাটওয়ারী (রহ.) ইহলোক ত্যাগের পূবে তার তৃতীয় পুত্র মো. মনিরুজ্জামান পাটওয়ারীকে মোতাওয়াল্লী পদে দায়িত্ব পালনের জন্য দায়িত্বভার অর্পণ করেন।

মনিরুজ্জামান পাটওয়ারী মোতাওয়াল্লী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর পিতার পরামর্শ মোতাবেক মসজিদের তৃতীয় অংশে দোতলা নির্মাণের অসমাপ্ত অংশের নির্মাণ কাজ চালিয়ে যান। তার দায়িত্ব গ্রহণের কয়েক বছর পর আহমাদ আলী পাটওয়ারী (রহ.) ইহলোক ত্যাগ করেন।

মোতাওয়াল্লী মনিরুজ্জামান পাটওয়ারী (রহ.) ভাড়া ঘর সমূহের উন্নয়নের কাজে মনোানিবেশ করেন। কাঁচা ভাড়াঘরসমূহ পাকা করার উদ্যোগ গ্রহণ করেন। তিনি বলতেন,‘অধিকাংশ ঘর কাঠ, বাঁশ এবং হােগলা পাতা এবং কিছু কিছু টিন দ্বারা নির্মিত হওয়ায় সম্পত্তি থাকা সত্ত্বেও খুব স্বল্প পরিমাণ ভাড়া আসে,তাও আবার মেরামতে খরচ হয়ে যায়। ঘরসমূহ ঠিক করা গেলে তার আয় দিয়ে মসজিদের উন্নয়ন এবং মুসুল্লীদের কল্যাণে কিছু কাজ করা সম্ভব হবে। চাপকলে পানি উঠানোর পাশাপাশি তিনি এস্টেটের আয় বৃদ্ধির জন্য ।

তিনটি মার্কেটের কাঁচা ঘর সমূহকে এক তলা দালানে রূপন্তরিত করেন এবং এতে করে আরও নতুন ভাড়াটিয়া বসানাে সম্ভব হয়। তিনি অজুর জন্য চাপ কলে পানি উঠানাের পাশাপাশি পাম্প মেশিনের সাহায্যে ট্যাংকিতে পানি জমা করে বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ সুনিশ্চিত করেন। ইমাম সাহেবের বাসা ও হেফজখানা দোতলা করেন।

মহিলা জিয়ারতকারীগণের জন্য আলাদা নামাজের স্থানের ব্যবস্থা করেন। মসজিদের তৃতীয় অংশের দোতলার অধিকাংশ কাজ শেষ করেন। তাছাড়া মসজিদের দক্ষিণ পার্শ্বে সিএন্ডবি রাস্তা সংলগ্ন অংশে মসজিদে প্রবেশের জন্য প্রবেশ পথে শাহী গেট নির্মাণ করেন। এছাড়া তিনি পিতা কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত সিনিয়র মাদ্রাসার স্থান সম্প্রসারণের লক্ষ্যে খালের উপর দেয়াল ও ভীম দিয়ে উত্তর দিকে মাদ্রাসা সম্প্রসারন করেন।

মসজিদের দক্ষিণে রাস্তার পাশে শাহী গেট নির্মাণে নকশা প্রণয়ণ করেন বর্তমান মোতাওয়াল্লী আলহাজ্ব আলমগীর কবির পাটওয়ারী। তিনি ছাত্রাবস্থায় গেটে রাজ কাজের অংশ হিসেবে টাইলস ও বাসন ভাঙ্গা কেটে কেটে গেইটের মনােরম নক্সার কাজও করেন। ইরাক থেকে ফিরে এসে তার চাচা শাহজাহান পাটওয়ারী নক্সার কাজে পূর্ণ মনােনিবেশ করেন। নক্সার কাজে তিনি রুচিশীল দক্ষ মানুষ ছিলেন।

মনিরুজ্জামান পাটওয়ারী (রহ.) তাঁর পরবর্তী মোতওয়াল্লী কে হবে, কার নিকট এ দায়িত্ব অর্পণ করবেন তা নিয়ে চিন্তা ভাবনা করেন।তাঁর বড় ছেলে আলহাজ্ব মো. আলমগীর কবির পাটওয়ারীকে মোতওয়াল্লী পদে দায়িত্ব প্রদানের সিদ্ধান্ত নেন এবং তিনি একটি রেজিস্টার্ড নিয়ােগপত্র দলিল সম্পাদন করেন। আলহাজ্ব ড. মো.আলমগীর কবির পাটওয়ারী তখন সৌদি আরবে জেদ্দা শহরে আল ওয়াহা ট্রাভেল এজেন্সির ম্যানেজার হিসেবে চাকুরিরত ছিলেন।

দলিল সম্পাদনের কয়েক মাস পর ১৯ আগস্ট ১৯৮৫ সোমবার বাজারের দিন অতি ব্যস্ততার মাঝে তাঁর বড় ছেলেকে পত্র পাওয়ামাত্র বাড়িতে আসার জন্য পত্র লিখেন। রাত ১০ টার পর তার আদরের ছোট মেয়ের জন্য ‘আম’ নিয়ে বাসায় ফেরেন এবং তাকে নিজ হাতে আম কেটে খাওয়ান। স্ত্রী হোছনে আরা বেগম সাথে আলাপরত অবস্থায় বলেন,‘আল্লাহ যেন আমার এমন মৃত্যু নছিব করেন,কাউকে যেন কষ্ট করতে না হয়।’

স্ত্রীর সাথে আলাপ চারিতার পর ঘুমাতে যান, একপর্যায়ে হঠাৎ রাত প্রায় পৌনে বার টার দিকে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাঁর হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে যায় এবং অতি অল্প সময়ের মধ্যে শেষ নি:শ্বাস ত্যাগ করেন (ইন্নালিল্লাহি—- রাজিউন)।

পিতার সমাধির পাশেই তাকে সমাহিত করা হয়। পিতার অছিয়ত ও পারিবারিক ঐতিহ্য রক্ষার স্বার্থে মো. আলমগীর কবির পাটওয়ারী আহমাদ আলী পাটওয়ারী ওয়াকফ এস্টেটের মতোাওয়াল্লী হিসাবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। শুরুতেই তিনি মসজিদ ও তার পাশাপাশি ধর্মীয় অন্যান্য সকল প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নমূলক কর্মকান্ডে নিজেকে নিয়ােজিত করেন।

তিনি মসজিদের জন্য প্রয়ােজনীয় ও যুগােপযােগী কিছু সংস্কার কার্যক্রমের পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। পাশাপাশি দারুল-উলুম সিনিয়র মাদ্রাসাকে আলীয়া মাদ্রাসায় উন্নীত করেন। এছাড়া হাফেজিয়া ও ফোরকানীয়া মাদ্রাসা, পিতার স্মৃতির। স্মরণে মুনিরীয়া নূরানী মাদ্রাসা, এতিমখানা, মুসাফিরখানা, ইসলামী পাঠাগার ও গবেষণাকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা এবং নিম্নভূমি ভরাটকরণসহ সংস্কার ও উন্নয়ন সম্বলিত এক বিরাট উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করেন এবং বাস্তবায়নের উদ্যোগ গ্রহণ করেন।

তথ্য সূত্র : হাজীগঞ্জ ঐতিহাসিক বড় মসজিদ কমপ্লেক্স এর প্রকাশিত স্মারক গ্রন্থ। সম্পাদনা : আবদুল গনি, ভার-প্রাপ্ত সম্পাদক , সাপ্তাহিক হাজীগঞ্জ। ১১ জুলাই ২০২৫

model

এছাড়াও দেখুন

poura

হাজীগঞ্জ পৌরসভা জেলার অন্যতম প্রথম শ্রেণির একটি পৌরসভা

হাজীগঞ্জ পৌরসভা বাংলাদেশের চাঁদপুর জেলার হাজীগঞ্জ উপজেলায় অবস্থিত একটি ‘ক’ শ্রেণির পৌরসভা। ইহা প্রতিষ্ঠালাভ করে …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *