আবদুল গনি
‘নাই টেলিফোন নাইরে পিয়ন নাইরে টেলিগ্রাম,বন্ধুর কাছে মনের খবর কেমনে পৌঁছাইতাম, বন্ধুরে তোর লাগি পরবাসী হইলাম।’ আধুনিক ব্যান্ড শো’র চাপে পুরানো শিল্পীর সেই গানের সুরের মতোই মোবাইলের অতিমাত্রার ব্যবহারে ক্রমান্বয়ে টেলিফোনও হারিয়ে যাচ্ছে। অথচ এককালে শহরের বাসা- বাড়িতে টেলিফোন ব্যবহার করতেন আভিজত্যের অংশ হিসেবে । জরুরি সব কথাই হতো টেলিফোনে ।
সরকারি সকল প্রকার যোগাযোগ হত টিলিফোনে। টেলিফোন সেটটি সব সময় টেবিলের সামনে প্রদর্শিত হতো। এখন আর সেই দৃশ্য দেখা যায় না। অথচ টেলিফোনের গ্রাহক হতে অনেক কাঠ-ঘড়ি পোড়াতে হত। সবই তথ্য-প্রযুক্তির ঊন্নতির ফলে ধামা-ধরা পদ্ধতির পরিবর্তন হয়েছে। বর্তমানে হাজীগঞ্জ উপজেলায় টেলিফোন একচেঞ্জটি ৮৯ জন গ্রাহকে টেলিফোন সেবা দিচ্ছে ।
সম্ভবত : ১৯৬০-৬১ সনে হাজীগঞ্জ টেলিফোন এক্সচেঞ্জ টি স্থাপিত হয় । নির্মাণের জন্য প্রায় ৮ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয় । কালের আবর্তে প্রয়োজনের তাগিদে ১৯৮৪ সালে ‘ মাইক্রোওয়েভ স্টেশন স্থাপিত হয়। টেলিফোন এক্স এসডি হাজীগঞ্জ এলাকার সরকারি-বেসরকারি-ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গ্রাহক সেবা দিয়ে থাকেন। পাশাপাশি মাইক্রোওয়েভ স্টেশনটি। টেলিফোন এক্সচেঞ্জটি হাজীগঞ্জ এলাকার সরকারি বেসরকারি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গ্রাহক সেবা দিয়ে থাকে ।
মাইক্রোওয়েভ স্টেশনটি পাশাপাশি ও সরকারি ও বেসরকারি সেবা দান করে থাকে। এটির জন্য রয়েছে ৩শ ৫০ ফিট উঁচু একটি টাওয়ার। এ টাওয়ার এর মাধ্যমে মাইক্রোওয়েব স্টেশন কাজ করে থাকে। বর্তমানে দুটো সরকারি গুরুত্বপূর্ণ বিভাগ। পাশাপাশি মাইক্রোওয়েভ স্টেশন। দুটো বিভাকে বাংলাদেশ টেলি কমিউনিকেশন এর অধীন গুরুত্বপূর্ণ সংস্থা।
মাইক্রোওয়েভ স্টেশন এর মাধ্যমেই হাজীগঞ্জ উপজেলার গুরুত্বপূর্ণ অফিস- আদালত, হাসপাতাল , ব্যাংক ,বীমা, গ্রামীণ, বাংলালিংক, রবি ও টেলিটক ইত্যাদি মোবাইল কোম্পানিগুলোর সেবা দিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু হাজীগঞ্জ টেলিফোন এক্সচেঞ্জটি করুণ অবস্থা বিদ্যমান। এর গ্রাহক সংখ্যা দিন দিন কমে আসছে। এক সময় যখন এটা চালু হয়েছিল তখন ছিল ১ হাজার গ্রাহক ক্ষমতা সম্পন্ন একটি এক্সচেঞ্জ।
হাজীগঞ্জ টেলিফোন একচেঞ্জ এর দায়িত্বপ্রাপ্ত জাকির হোসেন একজন টেকনিশিয়ান স্ব-পরিবার পরিজন নিয়ে এর ভেতর বসবাস করছেন কিন্তু এ ব্যাপারে তিনি কিছু বলেন নি। তার নিয়ন্ত্রণকারী অফিস হলো চাঁদপুর স্টেডিয়াম সংলগ্ন ।
কর্তব্যরত মাইক্রোওয়েব এর টেকনিশিয়ান মো. সিরাজুল ইসলাম বলেন, আমরা খুবই নিরাপত্তাহীনতায় মধ্যে রয়েছি। বিদ্যুৎ থাকলেও আবাসিক ভবনগুলো অনেকটাই পরিত্যক্তের মতো পড়ে আছে। কেউ থাকে না এখানে। গাছ গাছালি পরিপূর্ণ্। এক সময় এখানে কাঁটাতারের বেড়া ছিল। এখন সে গুলো নেই। চারদিক খোলা ।
এক্সচেঞ্জের পুরো এলাকাটি যেন ভুঁতুরে বাড়ি ; সন্ধ্যায় মাদকসেবী দখলে চলে যায়। হাজীগঞ্জ পুলিশের টহল থাকলেও মাদক সেবীরা থাকে ধরা-ছোঁয়ার বাহিরে। শৌচারগার নেই এখানে। আমরা দুজন এখানে আছি। আমি টেকনিশিয়ান অপর জন লাইন ম্যান।
টেকনিশিয়ান মো. সিরাজুল ইসলাম অপরেক প্রশ্নের জবাবে বলেন ,‘ আমাদের লাইনের কোনো সমস্যা হলে আমরা কুমিল্লা বিভাগীয় কর্মকর্তাকে অবহিত করি । তিনি এসে ব্যবস্থা নেন। ’
চাঁদপুর বিটিসিএল এর সহকারী সহকারী ব্যবস্থাপক মো. হাসিব আহমেদ ৬ মার্চ বলেন ,‘ মূলত আধুনিক তথ্য প্রযুক্তির উন্নতির ফলে আমাদের টেলিফোন গ্রাহক স্বাভাবিকভাবে কমে যাচ্ছে। তারপরও বিটিসিএল গ্রাহক বাড়ানোর জন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিচ্ছে।’
সারাদেশের ন্যায় চাঁদপুরেও টেলিকমিউনিকেশন লিমিটেড ( বিটিসিএল’)র এখন দুর্দিন। ফলে অন্যান্য উপজেলার মত দিন দিনই কমছে হাজীগঞ্জের বিটিসিএল টেলিফোনের ব্যবহার ও গ্রাহক সংখ্যা। ১৯৮২-৮৩ সালে টেলিফোনগুলো সরকারি সিদ্ধান্ত মতে সিদ্ধান্ত মতে এনালগ থেকে ২০০১ সালে ডিজিটালে রূপান্তর করা হয়।
২০০৩ সালে ডিজিটাল থেকে নতুন নাম সংস্করণ করেন। নতুন ভাবে টেলিফোন নাম্বারও সংস্করণ করে।বর্তমানে মোবাইল থেকেও কল করা যায় । টেরিফ মূল্য কম। ২০১৫ সালে বিটিএলসি নামে সংস্থার নাম সংস্করণ করা হয় কিন্তু গ্রাহক সংখ্যা বাড়েনি। সর্বশেষ প্রাপ্ত তথ্য মতে- পুরো হাজীগঞ্জ উপজেলায় ৮৯ জন গ্রাহক রয়েছে।
প্রসঙ্গক্রমে- জেলা জুড়ে এখন ২ হাজার ১শ’ ৩৪ জন গ্রাহক। যার অধিকাংশই সরকারি-অফিস আদালত। আগের মতো এখন কোনো উচ্চবিত্তদের বাসায় টেলিফোন রাখেন না। তবে সরকারি কিছু ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা সরকারি নির্দেশনা মানতে গিয়ে বাসায় টেলিফোন রাখেন। ২০১৬ সালে বিটিসিএল সূত্রে এর সংখ্যা প্রকাশ হয়েছিলো ২ হাজার ৩ শ’ ১৯ জন। এদের অধিকাংশই বর্তমানে সরকারি অফিস-আদালতে।
এক সময় যে কোনো ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে কিংবা বাসা বাড়িতে একটি টেলিফোনের সংযোগ নিতে অনেক কাঠখড়ি পোড়ানোর পর পাওয়া যেতো এমন কথা প্রবাদ বাক্যের মত শোনা যেতো। বর্তমানে আবেদন করলেই সংযোগ পাওয়া সম্ভব বলে জানিয়েছেন চাঁদপুরের বিটিসিএল কর্মকর্তারা। তারপরেও গ্রাহক বাড়ছে না উল্টো কমে যাচ্ছে। এ সবই সময়ের ব্যবধানের আধুনিক প্রযুক্তিগত দান।
চাঁদপুর জেলা টেলিফোন এক্সচেঞ্জগুলোর এক সময়ে গ্রাহক ক্যাপাসিটি ছিলো চাঁদপুরেরটি ৪,৪০০ টি যা বিটিসিএলে রূপান্তর হয় ২০০২ সালে, হাজীগঞ্জেরটি ২,০২৪ টি যা বিটিসিএলে রূপান্তর হয় ২০০৬ সালে, শাহারাস্তিটি ৯০০ টি যা বিটিসিএলে রূপান্তর হয় ২০০৩ সালে, কচুয়ারটি ৩০০ টি যা বিটিসিএলে রূপান্তর হয় ২০০১ সালে, মতলব দক্ষিণে ৯০০ যা বিটিসিএলে রূপান্তর হয় ২০০৩ সালে, মতলব উত্তরে ৫০০ যা বিটিসিএলে রূপান্তর হয় ২০০৯ সালে, ফরিদগঞ্জে ৫০০ যা বিটিসিএলে রূপান্তর হয় ২০০৬ সালে এবং হাইমচরে ৫০০ যা বিটিসিএলে রূপান্তর হয় ২০০৭ সালে।
বর্তমানে- চাঁদপুরের গ্রাহক সংখ্যা- ১ হাজার ৪ শ ৬৯ টি। এর মধ্যে চাঁদপুর সদরে ১০০৭ টি, হাইমচরে ৩৬ টি, কচুয়ায় ১০৮ টি ,হাজীগঞ্জে ৮৯ টি, শাহরাস্তিতে ৭১ টি ,ফরিদগঞ্জের ৫৪ টি, মতলব উত্তরে ৩৫টি এবং মতলব দক্ষিণে ৫৯ টিগ্রাহক রয়েছে।
১১ মার্চ ২০২৫
এজি

সাপ্তাহিক হাজীগঞ্জ অনলাইন পত্রিকা