September 17, 2021, 6:49 pm


দখল আর দূষণ ও রক্ষণা-বেক্ষণের অভােবে হাজীগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী বোয়ালজুরি খাল মৃত্যুর মুখে

অব্যবস্থপনা কিংবা দেখভালের অভাবে চাঁদপুরের হাজীগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী বোয়ালজুরি খাল মরতে বসেছে। প্রায় অর্ধশত কিলোমিটার দৈর্ঘের বোয়ালজুরি খালের উৎপত্তিস্থল হাজীগঞ্জের ডাকাতিয়া নদীর অংশ থেকে।

উৎপত্তিস্থল থেকে শুরু হয়ে হাজীগঞ্জ উপজেলা অংশের প্রায় ১০ কিলোমিটারের সবঅংশে কচুরী পানায় ঠাসা। অবাধে মাছ ধরা, দখল, ভেসাল জালের প্রতিবন্ধকতা, কৌশলে ভরাট করে বাড়ি নির্মাণ করায় খালটি মরতে বসেছে। বোয়ালজুরি খাল দিয়ে ডাকাতিয়া নদীর পানি সেচের মাধ্যমে হাজীগঞ্জ ও পাশ্ববর্তী কচুয়া উপজেলা বিস্তৃর্ণ এলাকার ইরি-বোর চাষাবাদ করা হচ্ছে। খালটি রক্ষনাবেক্ষণ না করলে দখল, শুকিয়ে যাওয়া, মাছের অবাধ বিচরণ বন্ধসহ বিস্তৃর্ণ এলাকা ইরিগেশনের সেচ বন্ধ হয়ে যাবে ঐতিহ্য হারাবে বোয়ালজুরি খালে।

স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা যায়, প্রায় দেড় দশক আগে এই খাল ছিলো অনেকটা পানি প্রবাহের একমাত্র মাধ্যমে।

হাজীগঞ্জের ডাকাতিয়া নদীর পানি হাজীগঞ্জ কচুয়া হয়ে মতলব মাছুয়াখালে মিশেছে। নানান প্রতিবন্ধকতায় এটি আজ বিভিন্নস্থান দিয়ে সরু হয়ে গেছে। খালের মুখ তথা হাজীগঞ্জ প্রধান ডাকঘর সংলগ্ন সামনের পুকুরে ছিলো এক সময় নৌকা ঘাট। এই ঘাট থেকে বোয়ালজুরি খাল ধরে হাজীগঞ্জের উত্তরাঞ্চলসহ কচুয়া উপজেলার হাজার হাজার মানুষ বারো মাস নৌকায় করে হাজীগঞ্জে যাওয়া আসা করতো। এখনাকার সিএনজি স্কুটার যেমনি যেখানে সেখানে থামানো যায়, সেই সময় বোয়ালজুরি খাল দিয়ে চলাচল নৌকাও যেখানে সেখানে থামানো যেতো। তখনকার সময় এই খালের দু‘পাড়ের সকল মানুষজন খালের পানিতে গোসলকরাসহ যাবতীয় কাজ করতো। এমনকি এই অঞ্চলের মানুষের মিঠা পানির মাছের বিপুল একটা চাহিদা বোয়ালজুরি খাল থেকে আসতো। যা গল্প ছাড়া আর কিছুই না।

সরজমিনে দেখা যায়, হাজীগঞ্জ পূর্ব বাজারস্থ বড় পুলের নীচে ডাকাতিয়া নদী হতে বোয়ালজুরি খালের উৎপত্তি। খালের এই অংশে অর্থাৎ এর মুখে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএডিসি) সেচ পাম্প বসিয়ে ইরিগেশনের মৌসুমে পানি সেচ করে বোয়ালজুরি খালের মাধ্যমে হাজীগঞ্জ ও কচুয়া উপজেলার বিস্তৃর্নী অঞ্চলে ইরিবোর চাষ করছে। হাজীগঞ্জ পৌরসভা এলাকা থেকে বেরিয়ে খালটি সোজা উত্তরে হাজীগঞ্জের সুহিলপুর বাজার হয়ে ধড্ডা খালপাড় ধরে কচুয়ার রঘুনাথপুর বাজরের পাশ ধরে হাজীগঞ্জ ও কচুয়া উপজেলার সীমান্তবর্তী বাজার চৌমুহুনী হয়ে মতলবের মাছুয়াখালে মিশেছে। হাজীগঞ্জ থেকে শুরু হয়ে চৌমুহনী পর্যন্ত খালের দৈর্ঘ প্রায় ১০ কিলোমিটার যার পুরোটাই কচুরী পানায় ঠাসা। এর মধ্যে বোয়ালজুলি খাল থেকে সোনাই বিবির খাল ও যুগির খালে নামে দুটি শাখা খাল বেরিয়ে একটি হাজীগঞ্জের কয়েকটি ইউনিয়নে ছুঁয়েছে অপরটি মতলবের নারায়ানপুরের দিকে চলে গেছে।

সরজমিনে আরো দেখা গেছে হাজীগঞ্জের সুহিলপুর, ধড্ডা খালপাড়, রঘুনাথপুর বাজার অংশে খালের উপর বহুজনে পিলার করে কিংবা সেমিপাকা করে দালানঘর তুলে ব্যবসা করছে স্থানীয়রা। তবে এদের অনেকেই জানিয়েছেন তাদের নিজস্ব জমি খালে রয়েছে। খালের বিভিন্ন স্থানে বহু ভেসাল জাল রয়েছে।

সুহিলপুর বাজার ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক আমির হোসেন জানান, খালের উপর কেউ জোর করে ঘর তুলেনি। খালের মুল সমস্যা কচুরী পানা।

এ সময় অপর এক ব্যবসায়ী জানান, গত বছর কিছু কচুরীপানা সরিয়ে খাল পাড়ে জমিয়ে রাখা হয়েছিলো কিন্তু ভেসাল জালের মালিকরা কচুরীপানা খালে নামিয়ে দেয়ায় এবারে খালে কচুরীপানায় একাকার হয়ে গেছে।

ধড্ডা খালপাড় এলাকায় স্থানীয় মজুমদার বাড়ির শাওন মজুমদারের জানান, এবারের এই সৃজনে যে পরিমান কৈ মাছের বাচ্ছা জাল দিয়ে ধরা হয়ে তা গননা করলে কয়েকটি কোটি কৈ মাছ হতো।

রঘুনাথপুর বাজারের খালের পূর্বপাশে পুরাতন ব্রীজের পাশে ভীত নিয়ে লম্বা পাকা দালান মার্কেট নির্মাণ করছেন স্থানীয় মোবারক হোসেনের ছেলে সাইফুল ইসলাম বাবু। তিনি জানান তিনি খালে দোকান নির্মানণ করছেন না, খালেই তাদের পৈত্রিক সম্পত্তি রয়েছে আর সেই কারণেই খালপাড়ে মার্কেট নির্মাণ করছেন।

হাজীগঞ্জের কালচোঁ উত্তর ইউনিয়নের পূর্ব অংশ ধরে বয়ে গেছে বোয়ালজুরি খাল। খালের অবস্থা নিয়ে সাপ্তাহিক হাজীগঞ্জকে ওই ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মানিক হোসেন প্রধানিয়া জানান, গতবছর খালের কচুরীপানা অপসারণের জন্য একটি উদ্যোগ নেয়া হয়েছিলো। তবে তা আর আলোর মুখ দেখেনি। এবারে আমরা হাজীগঞ্জের তিন চেয়ারম্যান মিলে ইউএনও স্যারের কাছে আবেদন করেছি যাতে করে খাল থেকে কচুরীপানা অপসারণ করা হয়।

খালের রক্ষাণাবেক্ষণ কিংবা কচুরীপানা অপসারনের বিষয়ে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন ( বিএনডিসি) হাজীগঞ্জ উপজেলা উপ-সহকারী নির্বাহী প্রকৌশলী মামুন রশিদ জানান, খাল রক্ষণা-বেক্ষণের জন্য আমাদের কোন বরাদ্ধ নেই।  তাই মৎস্য অফিস যদি এ বিষয়ে এগিয়ে আসে আমরা তাদেরকে সহযোগিতা করতে পারি।

কচুরীপানা বিষয়ে ইউএনও স্যারের সাথে কথা হয়েছে এ বিষয়ে তিনি উদ্যোগ নিচ্ছেন। অপর এক প্রশ্নে এই কর্মকর্তা বলেন, অক্টোবর মাসে খাল দিয়ে যখন বর্ষার স্বাভাবিক পানি নদীতে নামবে তখন ভেজালজালসহ খালের প্রতিবন্ধকতা সরিয়ে দিয়ে ৮০ভাগ কচুরীপানা নদীতে চলে আসবে।

হাজীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোমেনা আক্তার জানান, খালটি থেকে আমরা ভেসাল জাল অপসারণের জন্য উদ্যোগ নিয়েছি।

অপর এক প্রশ্নে এই কর্মকর্তা বলেন, বোয়ালজুরি খাল দখলের বিষয়টি আমার জানা নেই তবে বিষয়টি আমরা খতিয়ে দেখছি।

 এ কর্মকর্তা আরো বলেন, সহসাই খাল থেকে কচুরী পানা অপসারণ করে খালটি সৌন্দর্য্যবর্ধণ করা হবে। এ ব্যাপারে স্থানীয় চেয়ারম্যানগণ আমার সাথে যোগাযোগ করেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


সংবাদ পড়তে লাইক দিন ফেসবুক পেজে