Monday , 17 June 2024
forum

হাজীগঞ্জ বিজনেস পার্ক ট্রেড সেন্টারে আনন্দঘন ও জমকালো পিঠা উৎসব সম্পন্ন

হাজীগঞ্জ ফোরামের উদ্যোগে আবহমান কালের ঐতিহ্য দু’দিনব্যাপি আনন্দঘন ও জমকালো পিঠা উৎসব হাজীগঞ্জে সম্পন্ন হয়েছে। শুক্রবার ২৬ জানুয়ারি বিকেলে বাঙালির ঐতিহ্যকে ফুটিয়ে তোলার মাধ্যমে বিজনেস পার্ক ট্রেড সেন্টারের ফুড লাভারস পার্টি সেন্টারে দুদিনব্যাপি এ বর্ণিল পিঠা উৎসবের আয়োজন করে হাজীগঞ্জ ফোরাম নামে একটি সামাজিক সংগঠন। এসময় হরেক রকমের পিঠার সমাগমে পিঠার উৎসবে মেতে উঠেছিল হাজীগঞ্জবাসির অংশীজন।

এ পিঠা উৎসবের উদ্বোধন করেন চাঁদপুর জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার পংকজ কুমার দে। এ সময় হাজীগঞ্জ থানার ওসি মিন্টু দত্ত, হাজীগঞ্জ ফোরামের সমন্বয়ক ও পিঠা উৎসবের সভাপতি ব্যারিস্টার শাহরিয়ার আহমেদ। পিঠা উৎসবের সদস্য অধ্যাপক এস এম চিশতী,পিঠা উৎসব কমিটির আহবায়ক ও হাজীগঞ্জ প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি মহিউদ্দিন আল আজাদ ও সাধারণ সম্পাদক এনায়েত মজুমদার উপস্থিত ছিলেন।

প্রসঙ্গত, বাংলার সংস্কৃতি বৈচিত্র্যময়। বাংলাদেশ ও ভারত কৃষিপ্রধান দেশ। বিভিন্ন স্থানে পিঠাণ্ডপুলির মেলার আয়োজন করা হয়। পৌষ সংক্রান্তিতে অতিথিরা বেড়াতে আসেন। চলে পিঠা দিয়ে অতিথি আপ্যায়ন। ধনী-গরিব প্রতিটি ঘরে ঘরে সাধ্যমতো পিঠা বানানোর তোড়জোড় চলে। হাজার বছর ধরে বাঙালির ঘরে ঘরে এ সংস্কৃতি চলে আসছে।

এটা যতটা না খাওয়ার উৎসব তার থেকে বেশি বাংলার প্রাণের উৎসব। উৎসবের মতো করেই আয়োজন করে পিঠা খাওয়ার আয়োজন চলে আসছে। পিঠা খাওয়ার জন্য পৌষ-মাঘ বেছে নেয়ার কারণ হলো ঋতুর হিসেবে এ সময় শীতকাল চলে। পিঠার কথা উঠতেই বাংলামুলুকে পৌষের কথা আসে। পৌষের শীতে জমে ওঠে পিঠাপুলির আয়োজন। এ মাস এলেই সবাই যেন এ আয়োজনের আনুষ্ঠানিকতা শুরু করে পৌষসংক্রান্তিতে। পৌষসংক্রান্তি আবহমান বাংলার এক চিরায়ত সংস্কৃতি। পিঠা উৎসবের সঙ্গে এর ঘনিষ্ঠ যোগসূত্র রয়েছে। এর আরেক নাম মকরসংক্রান্তি।

নতুন ধান, খেজুরের গুড় এবং পাটালি দিয়ে বিভিন্ন ধরনের ঐতিহ্যবাহী পিঠা তৈরি করা হয়। যার জন্য প্রয়োজন হয় চালের গুঁড়া, নারিকেল, দুধ আর খেজুরের গুড়। পৌষ সংক্রান্তির মাধ্যমে আমরা পৌষ মাসকে বিদায় জানাই ও মাঘ মাসকে আলিঙ্গন করি। সংক্রান্তির দিনে বাংলার বধূরা নিজেদের সামর্থ অনুযায়ী বিভিন্ন নকশা ও স-ুস্বাদু পিঠা তৈরি করেন। পঞ্জিকা মতে, পৌষ সংক্রান্তি পালিত হয় পৌষ মাসের শেষ দিন। জানুয়ারির মাঝামাঝি সময়ে শুরু হয় এ দিন।

পৌষ মাসের শেষ দিনে এ সংক্রান্তি পালন করা হয়। বিশেষ করে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের কাছেও বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এ দিনেই আনুষ্ঠানিকভাবে খোলা পুড়িয়ে পিঠা তৈরি শুরু করে। অনেকেই আজও এ দিনের আগে পিঠা খান না। আর তাই এ সংক্রান্তি পিঠা উৎসবে পরিণত হয়েছে। বাংলা পৌষ মাসের শেষের দিনে এ উৎসব হয়ে থাকে। চলে জামাইকে নিমন্ত্রণ অথবা জামাইয়ের বাড়িতে তৈরি পিঠা পৌঁছে দেয়ার পালা।

একসময় গ্রাম বাংলায় বেশ ঘটা করে এ দিন পালনের রেওয়াজ ছিল। তবে কালের বিবর্তনের সঙ্গে হারিয়ে গেছে সে সব রীতিনীতি। তা ছাড়া বিকাল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামলেই বাজি ফুটানো, ফানুস ওড়ানো এসব আনন্দ উৎসবের ভেতর দিয়ে আনন্দমুখর এ উৎসবের সমাপ্তি ঘটত। পিঠা যে শুধু খাওয়া নয় বরং সবাই মিলে আনন্দ করার এক অনুষঙ্গ সেটাও টের পাওয়া যায় এ উৎসব থেকে।

পিঠা তৈরির নানা রকমের গুড় এ সময় বাজারে আসে। মিষ্টি খেজুরের রস থেকে খেজুরের গুড়, পাটালি গুড়, নলেন গুড়- এসব এ সময়েই পাওয়া যায়। গুড়ের মিষ্টি গন্ধে চারদিকে মণ্ডম করে। এ সব গুড় থেকে তৈরি পিঠা খেতে অত্যন্ত মজাদার। এসব গুড় শীতকাল ছাড়া দেখা পাওয়া যায় না। তাই পিঠা তৈরির জন্য শীতকালই উপযুক্ত। তা ছাড়া শীতের সকালের পিঠার স্বাদ অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে আলাদা। ঋতুর বৈচিত্র্যময়তা যে এক্ষেত্রে প্রভাব ফেলেছে তা বলাই বাহুল্য। তাইতো বাঙালি পিঠা প্রিয় সেইসঙ্গে অতিথিপ্রিয়ও বটে।

‘পিঠে’ শব্দটি সংস্কৃত ‘পিষ্ঠক’ থেকেই এসেছে। পিঠে-পুলি খাওয়ার চল গ্রামবাংলার অস্থিমজ্জায় মিশে আছে। এমনভাবে মিশেছে যেন পিঠে নিজেই এক উৎসবের নাম। পিঠা আর আমরা বাঙালিকে আলাদা করার কোনো সুযোগ নেই। বাঙালি কতটা অতিথি পরায়ন তা এ সময় বেশ ভালোভাবেই বলা যায়। এ সময় নতুন ধান ওঠে, খেজুর গাছের হাঁড়ি বাঁধার দৃশ্য নিয়মিত। এ খেজুর গাছে হাঁড়ি বাঁধার দৃশ্যও দেখার মতো। রস থেকে গুড় বানানোর পদ্ধতিও এক দেখার মতো বিষয়। দু’ ধরনের খেজুর গুড় সংগ্রহ করার পদ্ধতি আছে ।

এক হলো প্রতিদিনের সন্ধ্যায় নতুন হাঁড়ি লাগিয়ে রাখা থাকে, পরদিন সূর্যোদয়ের আগেই তা সংগ্রহ করে ফের নতুন হাঁড়ি লাগিয়ে দিয়ে যায় গাছিরা। গাছের রস একদিন জিরিয়ে নিলে, তার থেকে আরো ভালো মানের রস পাওয়া যায়, মধুর মতো মোলায়েম ও পাতলা ।

এ নতুন গুড় মেশানো দুধের মধ্যে নারকেল পুরের সাদা সাদা পুলিপিঠের সোহাগি সাঁতার চোখ আর মনকে তৃপ্তি তো করেই, তার সঙ্গে জিভের জন্য যে অসাধারণ স্বাদের জোগান দেয় তার সঠিক বর্ণনা বোধহয় শুধুমাত্র জিভের স্বাদকোরকগুলোর কাছেই লুকিয়ে থাকে। বাংলাদেশের বিশেষ কিছু পিঠার মধ্যে অন্যতম হলো বিনি পিঠা,মালপোয়া পিঠা, সিমুই পিঠা, সূর্যমুখী পিঠা, ঝিনুক পিঠা চিতা পিঠা, খেজুর পিঠা, বিনুনীর মতো গড়া বেনি পিঠা, ঝাল কুশ পিঠা, মিঠে নকশায় সাজানো নকশই পিঠে, পাঁপড়ের আকারের মলকো পিঠা, করলা পিঠা, চঙ্গা পিঠা, মুঠা পিঠা ও রস চিতই পিঠা।

বর্তমানে বাজারে কেক,প্যাটিস পিৎজাসহ বাজারজুড়ে ফাস্টফুডের দাপট। নতুন প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা পিঠে-পুলির স্বাদ ভুলতে বসেছে। বাজারে গিয়েই দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে তেলে ভাজা চপ, বেগুনি খাওয়ার দৃশ্যই এখন পরিচিত। পিঠা বিষয়টা যেন বেশির ভাগ সময়ই অপরিচিত থাকে নতুন প্রজন্মের কাছে। আজকাল অনেক তরুণী ও বধূদের অনেকেই পিঠে-পুলি ও পাটিসাপটা কীভাবে তৈরি করতে হয় তা শেখেই নি ।

তবে বিষয়টা হলো পিঠা হলো আমাদের সংস্কৃতির একটা অংশ। আমরা চাইলেও সে অংশকে আলাদা করতে পারব না। এসব ভেবেই হাজীগঞ্জ ফোরাম এ পিঠা উৎসবের আয়োজন করে।

আবদুল গনি ও মোহাম্মদ মেহেদী হাসান
৩০ জানুয়ারি ২০২৪
এজি

এছাড়াও দেখুন

sGA-1-660x330

হাজীগঞ্জ ফোরামের সভাপতি‘র ঈদ শুভেচ্ছা

ঈদ মোবারক। পবিত্র কোরবানির ঈদ বা ঈদুল আযহা আমাদের মাঝে সমাগত। মধ্যপ্রাচ্য সহ বিশে^র বিভিন্ন …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *