Wednesday , 19 June 2024
hajigonj
ছবি : ওয়েবসাইড থেকে সংগৃহীত ও সংযোজিত

হাজীগঞ্জ ঐতিহাসিক বড় মসজিদে প্রতি জুমায় নেয়া হয় নামাজ আদায়ে বিশেষ ব্যবস্থা

হাজীগঞ্জ ঐতিহাসিক বড় মসজিদে জুমা’র দিনের বিশেষ মর্যাদার কারণে আযানের পর পর মসজিদ হয়ে উঠে কানায় কানায় পরিপূর্ণ। ফলে মুসল্লীদের নামাজ আদায়ে কর্তৃপক্ষ নিয়ে থাকে বিশেষ ব্যবস্থা। ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় মসজিদটিতে পবিত্র রমজান মাসেও রোজা রেখে দূর-দূরান্ত থেকে অনেক কষ্ট করে লক্ষাধিক রোজাদার মুসল্লি এখনো জুমাতুল বিদা ও জুমার নামাজের জামাতে সমবেত হয়ে থাকে। এ ছাড়াও প্রতি জুমায় মসজিদের ভেতরের উভয় তলা পরিপূর্ণ হয়ে মসজিদের সামনের মাঠ কানায় কানায় পরিপূর্ণ হয়ে উঠে বেলা সাড়ে ১২ টার আযানের পর।

এরপর বিশেষ দিবস হলে বিশেষ আলোচনা, সমসায়িক বিষয়ের উপর আলোচনা, সরকার ও ইফার নির্দেশিত বিষয়ের আলোচনা হয়ে থাকে হাজীগঞ্জ ঐতিহাসিক বড় মসজিদে। এর নিয়মিত খতিব হিসেবে সুদীর্ঘ বেশ ক’বছর যাবৎ দায়িত্ব পালন করছেন-মুফতি আবদুর রউফ। দূর-দূরান্ত থেকে আসা প্রায় ৫ শতাধিক মহিলা প্রতি জুমাবার দিন পৃথকভাবে ও যথাযথ পর্দার পরিবেশে বিশেষ ব্যবস্থার কারণে এ মসজিদে জুমার নামাজ আদায় করে থাকে। একত্রে প্রায় আড়াইশ’ মুসল্লী একসাথে ওযু করতে পারে।

সবদিক থেকে শতভাগই পরিষ্কার–পরিচ্ছন্ন পরিবেশে মুসল্লীগণ যাতে নামাজসহ অন্যান্য নফল এবাদত-বন্দিগী করতে পারে- এমন ব্যবস্থা নিয়মিতভাবে করার উদ্যোগও গ্রহণ করে থাকেন- মসজিদ কর্তৃপক্ষ। প্রয়োজনীয় সংখ্যক জনবল, স্বেচ্ছাসেবকদল, বিদ্যুৎ ব্যবস্থা, সামিয়ানা টানানো ও ফ্লোরে নামাজ আদায়ের উপযোগী ব্যবস্থা গ্রহণ,বৃষ্টিবাদল হলে মাঠ থেকে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা,ওয়াসব্লক পরিচ্ছন্ন রাখার উদ্যোগ- প্রভৃতির যেন কোনোটারই কমতি নেই। এ জন্যেই প্রতি জুমাবারে দূর-দূরান্ত থেকে হাজার হাজার মুসল্লী হাজীগঞ্জ ঐতিহাসিক বড় মসজিদে এসে জুমা আদায় করে থাকে। ইসলামে জুমার দিনটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত। প্রতি জুমাবারে ধর্মপ্রাণ মুসলমানগণের আগমন হয়ে থাকে।

এদিকে হাজীগঞ্জ ঐতিহাসিক বড় মসজিদ এ অঞ্চলের অন্যতম মুসলিম নিদর্শন হিসেবে পরিচিত। মসজিদটি নির্মাণকালে স্থাপত্যশিল্পের যে নির্মাণশৈলী দেয়া হয়েছে,তা যেন স্থাপত্যশিল্পেরই বিশুদ্ধ ব্যাকরণ। মসজিদের বিভিন্ন অংশে যে কারুকাজ ফুটিয়ে তোলা হয়েছে- তা কালের সাক্ষ্য বহন করছে। ঐতিহ্যবাহী এ মসজিদ তিন অংশে নির্মিত হয়েছে।

প্রথম অংশ ৪ হাজার ৭শ ৮৪ বর্গফুট, মাঝের অংশ ১৩ হাজার ৬ বর্গফুট এবং তৃতীয় অংশে ১ হাজার ৬শ ১৫ বর্গফুট। ২৮ হাজার ৪শ ৫ বর্গফুট আয়তনের ওই মসজিদের প্রথম অংশে হজরত মাওলানা আবুল ফারাহ জৈনপুরী (রহ.) ভারী শরীর নিয়ে মাচার ওপর বসেন এবং তাঁর পবিত্র হাতে চুন-সুরকির মসলা কেটে কেটে মেহরাবসংলগ্ন দেয়াল ঘুরিয়ে মসজিদের প্রথম অংশের ওপরের দিকে ‘সুরা ইয়াছিন’ ও ‘সুরা জুমআ’ লিপিবদ্ধ করেন।

বর্তমান সময়ে সংস্কারকালে তা উঠিয়ে মসজিদের কবরস্থানে দাফন করা হয়। ওই মসজিদের অনন্য সুন্দর মেহরাবটি কাচের ঝাড়ের টুকরো নিখুঁতভাবে কেটে কেটে মনোরম ফুলের ঝাড়ের মতো আকর্ষণীয় নকশায় সাজিয়ে তোলা হয়েছে। মাঝের অংশটি ৭৭ টি আকর্ষণীয় পিলার ও ঝিনুকের মোজাইক দিয়ে নির্মিত হয়েছিল। তৃতীয় অংশটিতে রয়েছে তিনটি বিশাল গম্বুজসহ আকর্ষণীয় বিশাল সু-উচ্চ মিনার। যা মসজিদটিকে আলাদা বিশেষত্ব দান করেছে।

১৯৫৩ সালে ১শ ২২ ফুট উঁচু এ মিনারটি তৈরি হয়েছিল। সুউচ্চ এ মিনারটিরও আলাদা একটি বৈশিষ্ট্য রয়েছে। আর তা হলো—মসজিদের প্রধান প্রবেশদ্বারের ওপর এত উঁচু মিনারের উপস্থিতি সেকালের নির্মাণ বিষয়টিকে ভাবিয়ে তোলে। মিনারের উঁচু প্ল্যাটফর্মে বহু মুসল্লি ও পর্যটক উঠে হাজীগঞ্জের চারপাশের দৃশ্য অবলোকন করেন। প্রতিদিন মিনারের উঁচু থেকে একযোগে মাইকে আজান প্রচার করা হয়। বহু দূরদূরান্ত থেকে এ আজানের ধ্বনি শোনা যায়।

কারুকার্যখচিত মসজিদের সর্বশেষ পূর্ব প্রাচীরে পবিত্র কালেমা শরিফ খচিত চীনা বাসনের টুকরো দিয়ে তৈরি মনোরম ফুলের ঝাড়ের মতো আকর্ষণীয় করে সাজানো বিশাল ফটক। মসজিদে প্রবেশের সুবিশাল ফটকের আকর্ষণীয় সাজ দর্শনার্থীদের মন কেড়ে নেয়। পাথরের সাজে সজ্জিত অসংখ্য তারকাখচিত তিনটি বড় বড় গম্বুজ পর্যটকদের আকর্ষণ করে। মসজিদটি পবিত্র রমজান মাসে জুমাতুল বিদার জামাতের জন্য ঐতিহাসিকভাবে প্রসিদ্ধ রয়েছে। একসময় পাক-ভারত উপমহাদেশের মধ্যে হাজীগঞ্জ ঐতিহাসিক বড় মসজিদ অনন্য বৃহত্তম জুমাতুল বিদা নামাজের জামাত উদ্যাপনের প্রতিষ্ঠান হিসেবে খ্যাত ছিল।

জুমার দিনের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ আমল সম্পর্কে নিম্নে আলোচনা করা হলো:

১. জুমার দিনের বিশেষ মর্যাদা : আবু লুবাবা বিন আবদুল মুনজির (রা.) থেকে বর্ণিত, হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) জুমার দিনের পাঁচটি বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করেছেন। সেগুলো হলো- এক. আল্লাহ তাআলা এ দিনে আদম (আ.)-কে সৃষ্টি করেছেন। দুই. আল্লাহ তাআলা এ দিনে আদম (আ.)-কে জমিনে অবতরণ করিয়েছেন। তিন. এ দিনে আদম (আ.)-কে মৃত্যু দিয়েছেন। চার. এ দিনে এমন একটি সময় আছে, যখন বান্দা আল্লাহর কাছে যা কিছুই প্রার্থনা করবে তিনি তা দেবেন। যতক্ষণ সে হারাম কিছু প্রার্থনা করবে না। পাঁচ. এ দিনে কিয়ামত সংঘটিত হবে।’ (ইবনে মাজাহ, হাদিস : ৮৯৫)

২. জুমার নামাজ আদায়: সালমান ফারসি থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি জুমার দিন গোসল করল, সাধ্যমতো পবিত্র হলো, তেল ব্যবহার করল, ঘর থেকে সুগন্ধি ব্যবহার করল, অত:পর মসজিদে এলো, সেখানে দুজন মুসল্লির মধ্যে ফাঁক করে সামনে এগিয়ে যায় না, নির্দিষ্ট পরিমাণ নামাজ পড়ল, অতঃপর ইমাম কথা শুরু করলে চুপ থাকল; তাহলে আল্লাহ তাআলা তাঁর দুই জুমার মধ্যবর্তী সময়ের গুনাহ মাফ করবেন।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৮৮৩)।

অন্য হাদিসে এসেছে, আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ, এক জুমা থেকে পরবর্তী জুমা, এক রমজান থেকে পরবর্তী রমজান মধ্যবর্তী সময়ের পাপ মোচন করে; যদি সেই ব্যক্তি সব ধরনের কবিরা গুনাহ থেকে বিরত থাকে।’ (মুসলিম, হাদিস : ২৩৩)

৩. জুমার দিন গোসল করা: জুমার দিন গোসল করা ও আগে আগে মসজিদে যাওয়া অত্যন্ত সওয়াবের কাজ। আউস বিন আউস সাকাফি (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি জুমার দিন ভালো করে গোসল করল, দ্রুততর সময়ে মসজিদে গেল ও (ইমামের) কাছাকাছি বসে মনোযোগসহ (খুতবা) শুনল, তাঁর জন্য প্রতি কদমের বদলে এক বছরের রোজা ও নামাজের সওয়াব থাকবে। ’ (আবু দাউদ, হাদিস : ৩৪৫)

৪. মসজিদে প্রথমে প্রবেশ করা : জুমার দিন মসজিদে আগে প্রবেশ করা ও মনোযোগ দিয়ে খুতবা শোনার বিশেষ গুরুত্ব আছে। রাসুল (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি জুমার দিন গোসল করল, অতঃপর প্রথমে মসজিদে গেল সে যেন একটি উট কোরবানি করল। যে এরপর মসজিদে গেল, সে যেন একটি গরু কোরবানি করল। আর যে এরপর ঢুকল, সে যেন ছাগল কোরবানি করল, এরপর যে ঢুকল সে যেন মুরগি কোরবানি করল, আর যে এরপর ঢুকল সে ডিম সদকা করল। অতঃপর ইমাম খুতবার জন্য এলে ফেরেশতারা আলোচনা শোনা শুরু করে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৮৪১)

৫. জুমার দিন দোয়া কবুল হয় : জুমার দিন একটি সময় আছে, যখন মানুষ আল্লাহর কাছে কোনো দোয়া করলে আল্লাহ তা কবুল করেন। জাবের (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেন, ‘জুমার দিন কোনো মুসলিম আল্লাহর কাছে ভালো কিছুর দোয়া করলে আল্লাহ তাকে তা দেন। তোমরা সময়টি আছরের পর অনুসন্ধান কোরো।’ (আবু দাউদ, হাদিস নম্বর : ১০৪৮) । জাবের ইবনে আবদুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘জুমার দিনের বারো ঘণ্টার মধ্যে এমন একটি মুহূর্ত রয়েছে যদি কোনো মুসলিম এ সময় আল্লাহর কাছে কিছু প্রার্থনা করে, তাহলে মহান ও সর্বশক্তিমান আল্লাহ তাকে দান করেন। এ মুহূর্তটি তোমরা আছরের শেষ সময়ে অনুসন্ধান কোরো। (আবু দাউদ, হাদিস : ১০৪৮)

৬. সুরা কাহাফ পাঠ : জুমার অন্যতম আমল সুরা কাহাফ পাঠ করা। আবু সাইদ খুদরি (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি জুমার দিন সুরা কাহাফ পড়বে তা দু জুমার মধ্যবর্তী সময়ে তার জন্য আলোকিত হয়ে থাকবে। আর যে ব্যক্তি এ সুরার শেষ ১০ আয়াত পাঠ করবে অত:পর দাজ্জাল বের হলে তার কোনো ক্ষতি করতে পারবে না। যে ব্যক্তি অজুর পর এ দোয়া পড়বে তার নাম একটি চিঠিতে লেখা হবে। অতঃপর তাতে সিল দেয়া হবে, যা কেয়ামত পর্যন্ত আর ভাঙা হবে না।’ (সহিহ তারগিব, হাদিস : ১৪৭৩, আল মুসতাদরাক : ২/৩৯৯)

৭. গুনাহ মাফ হয় : সালমান ফারসি থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি জুমার দিন গোসল করল, সাধ্যমতো পবিত্র হলো, তেল ব্যবহার করল, ঘর থেকে সুগন্ধি ব্যবহার করল, অত: পর মসজিদে এলো, সেখানে দুজন মুসল্লির মধ্যে ফাঁক করে সামনে এগিয়ে যায় না, নির্দিষ্ট পরিমাণ নামাজ পড়ল, অতঃপর ইমাম কথা শুরু করলে চুপ থাকল; তাহলে আল্লাহ তাআলা তাঁর দু’ জুমার মধ্যবর্তী সময়ের গুনাহ মাফ করেন।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৮৮৩)

৮. দরুদ পাঠ : জুমার দিন নবীজি (সা.)-এর ওপর বেশি বেশি দরুদ পাঠ করা কর্তব্য। আউস বিন আবি আউস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের দিনগুলোর মধ্যে জুমার দিন সর্বোত্তম। এ দিনে আদম (আ.)-কে সৃষ্টি করা হয়েছে। এ দিনে তিনি ইন্তেকাল করেছেন। এ দিনে শিঙায় ফুঁ দেয়া হবে এবং এ দিনে সবাইকে বেহুঁশ করা হবে।

অতএব- তোমরা এ দিনে আমার ওপর বেশি পরিমাণ দরুদ পড়ো। কারণ জুমার দিনে তোমাদের দরুদ আমার কাছে পেশ করা হয়।’ সাহাবারা বললেন, আমাদের দরুদ আপনার কাছে কিভাবে পেশ করা হবে, অথচ আপনার দেহ একসময় নি:শেষ হয়ে যাবে? তিনি বলেন,‘আল্লাহ জমিনের জন্য আমার দেহের ভক্ষণ নিষিদ্ধ করেছেন।’ (আবু দাউদ, হাদিস : ১০৪৭)। (সংকলিত ও সাপ্তাহিক হাজীগঞ্জ এর সম্পাদনা বিভাগ কর্তৃক সম্পাদিত) নভেম্বর ২০২৩।

২৫ ডিসেম্বর ২০২৩
এজি

এছাড়াও দেখুন

কবি নজরুলের ১২৫তম জন্মজয়ন্তী আজ

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১২৫তম জন্মজয়ন্তী ২৫ মে আজ শনিবার । তাঁর উপন্যাস, নাটক, …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *