April 21, 2021, 11:49 am


প্রকৃতির অপূর্ব এক মাধুর্যের সমস্বয় চীনা মাটির পাহাড়ে

—-অমৃত ফরহাদ—-

২০২০ সালটির শুরুর দিকটা ভালোই কেটেছে। জানিনা সামনের দিনগুলো কেমন কাটবে। তবে আশা করি ভালোই যাবে। বছরটি আমাকে এনে দিয়েছে অনাবিল প্রশান্তি। ফেব্রুয়ারির শুরুর দিকে মুঠোফোনে একটি বার্তা এলো দৈনিক চতুর্দিক থেকে। ‘চতুর্দিক আনন্দ ভ্রমণ- ২০২০’। স্থান নেত্রকোনা। নেত্রকোনা সম্পর্ক তেমন ধারণা নেই। তারপরও রাজি হয়ে গেলাম, অন্তত অভিজ্ঞতা নেওয়া যাবে। বন্ধু বর কবি জামানকে বিষয়টি নিশ্চিত করলাম। জামান পত্রিকাটির নির্বাহী সম্পাদক। পত্রিকার বার্তাটি আমার আরেক বন্ধু মাসুদ আলম সামাদকে দেখাই। সামাদও যাওয়ার আগ্রহ দেখালো।

২০ ফেব্রুয়ারি দুপুরের খাবার খেয়ে দুই বন্ধু রওয়ানা দিলাম ঢাকার উদ্দেশ্যে। যদিও আমাদের বাস নেত্রকোনার উদ্দেশ্যে ছেড়ে যাবে রাত ১২টার দিকে। একটু আগে রওয়ানা দেওয়ার কারণ হলো সন্ধ্যার দিকে একুশের বই মেলাতে আড্ডা দিবো। ঠিক মতোই সদর ঘাটে পোঁছলাম। ফরিদগঞ্জ থেকে সদরঘাট আসতে যে সময় লেগেছে। সদরঘাট থেকে গুলিস্তান আসতে একই সময় লেগেছে। এদিকে বই মেলাতে কবি শিমুল জাবালী, জামান এবং মামুনুর রশিদ মিলনসহ বেশ কয়েকজন অপেক্ষা করছে আমার জন্য। বার বার ফোন দিয়ে খোঁজ খবর নিচ্ছে কতটুকু এসেছি। কিন্তু এমন জ্যামেই পড়েছি যে, বই মেলাতে যাওয়া আর হলো না। জামান আমাকে বললো শিল্পকলা একাডেমিতে চলে যেতে। ঐখান থেকেই আমাদের বাস চেড়ে যাবে। অবশেষে রাত সাড়ে নয়টায় আমরা বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিতে পৌঁছলাম।

যখন জ্যামে ছিলাম তখনই জল বিয়োগের অবস্থানে ছিলাম। কিন্তু রিক্সা থেকে পা পেলার জায়গা নেই। ধরে রাখলাম এ আশায় যে জাতীয় শিল্পকলা একাডেমিতে গিয়ে সারবো। কিন্তু বিধিবাম শিল্পকলা বন্ধ। এদিক সেদিক খুঁজলাম পেলাম না। লোকজনকে প্রশ্ন করেও সঠিক কোনো জবাব পাচ্ছি না। গাড়ীর হেলপারকে জিঙ্গেস করলাম, সে বললো ‘ভাই আমারও প্রচন্ড প্রেসসাব দরেছিল, কোথায়ও না পেয়ে ঐযে রাস্তার পাশে পিলার দেখছেন না, সেখানে সেরেছি’। বলে কী ছেলে? আমরা রাস্তায় দাঁড়িয়ে…….। এদিকে প্রচন্ড খিদা লেগেছে। সামাদ বললো, আমরাতো বোকা, হোটেলে গেলেইতো ওয়াস রুম পাওয়া যাবে। এবার হোটেল খুঁজতে লাগলাম। অল্প সময়ের মধ্যে একটি হোটেল পেয়ে গেলাম। কিছুক্ষণ খুঁজলাম, কিন্তু ওয়াসরুম পেলাম না।

এদিকে সামাদের খুব খিদা সে ফ্রেস হয়ে খাবারের ওয়ার্ডার দিলো। খাবার চলে এলো। আমি রণে খান্ত দিয়ে খাবার খেতে লাগলাম। খাওয়া শেষে যে লোকটি বিলের কাগজ নিয়ে এলো তাকে বিল এবং কিছু বখশিস দিয়ে বললাম,‘ভাই তোমাদের ওয়াস রুম নেই? সে বললো, আছে তো। আমি জানতে চাইলাম সেটা কোথায়? সে ২য় তলায় দেখিয়ে দিলো। সেখানে গিয়ে যেই না দরজা খুললাম, প্রচন্ড গ্যাস আমার নাকে প্রবেশ করলো। মনে হচ্ছে যা খেয়েছি প্রচন্ড বেগে তা বেরিয়ে আসবে। তীব্র গন্ধে প্রাণ যায় যায় অবস্থা। জল বিয়োগ না করেই কোনো রকম প্রাণ নিয়ে বেরিয়ে এলাম। আবার খুঁজতে লাগমা জল বিয়োগের উপযুক্ত স্থান। প্রায় ঘন্টাখানিক খোঁজার পর একটি মসজিদের দেখা ফেলাম। মসজিদের প্র¯্রাব খানায় অবশেষে বিয়োগ করে শান্তি ফিরে পেলাম। প্রমাণ হলো ‘ত্যাগই প্রকৃত সুখ’।

বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিতে ফিরে এসে দেখি জামান অন্যদের সাথে গল্প করছ। সে আমাকে অন্য সবার সাথে পরিচয় করিয়ে দিলো। বিশেষ করে- দৈনিক চর্তুদিক পত্রিকার প্রকাশক দেলোয়ার হোসেন সৈকত, বিশিষ্ট ব্যবসায়ী মনিরুজ্জামান, বিশিষ্ট ছড়াকার ও দৈনিক আলোকিত প্রতিদিন এর সম্পাদক সৈয়দ আহসান কবির , দৈনিক চুর্তদিক পত্রিকার সম্পাদক মহিব আফনান’র সাথে।

গাড়ীটি দেখে ভালো লাগলো। বাহির থেকে দেখেই পছন্দ হয়ে গেলো। ভিতরে ঢুকে সিটসহ পরিবেশ দেখে মন ভরে গেলো। এমনিতেই গন্ধহীন, অনেক জায়গা, বড়সড় সিট, তারউপর শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত। গাড়ীর কথা বিশেষভাবে বলার কারণ হলো, গাড়ীতে করে যতগুলো ভ্রমণ করেছি সবচেয়ে সুন্দর এবং আরামদায়ক বাস হলো এই গাড়িটি। ‘আর্মি ট্রাস্ট ট্রান্সপোর্ট সার্ভিসেস’ গাড়ীর কথাই বলছি। এই সুযোগে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বন্ধুবর কবি জামান এবং ভ্রমণের সাথে সংশ্লিষ্ট সকল দায়িত্বশীলকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি আমাকে যথাযথ সম্মান জানানোর জন্য। রওয়ানা দেওয়ার আগে আমরা সবাই একটা গ্রুপ ছবি তুললাম।

নির্দিষ্ট সময়ে জামানের স্বাগত বক্তব্যের মাধ্যমে আমরা যাত্রা শুরু করলাম। গাড়ী চলার প্রায় এক ঘন্টা পর খন্দকার ছাইম ও নকীব হাসান সবাইকে হালকা নাস্তা দিয়ে গেলো। গানে গানে সবাই কিছুক্ষণ মাতোয়ারা ছিলো। তারপর নিস্তব্ধতা। শুধু বাতাস কাটার সাঁই সাঁই শব্দ আর মাঝে মাঝে গাড়ির হর্ণ। একসময় ঘুমের রাজ্যে প্রায় সবাই হারিয়ে গেলো। গাড়ী থামার শব্দে সবার ঘুম কেটে গেলো। গাড়ী থেকে নেমে দেখি আমরা সুসঙ্গ মহাবিদ্যালয় এর সামনে। তখন ভোর ৬টা। পাশেই দূর্গাপুর মহিলা ডিগ্রী কলেজ। সেখানে গিয়ে আমরা ফ্রেস হলাম। কলেজের অধ্যক্ষ ওমর ফারুক আমাদেরকে চা খাওয়ালেন। একটি টয়লেটে সবাই ফ্রেস হতে কিছুটা সময় লেগেছে। কেউ ফ্রেস হচ্ছে, কেউ চা পান করছে, এ সুযোগে কেউ আবার মোবাইলে চার্জ দিয়ে নিচ্ছে। মাঠে জামান ভ্রমণের টিশার্ট ভিতরণ করছে। এদিকে আমাদেরকে স্বাগত জানাতে হাজির হলেন দূর্গাপুর প্রেসক্লাব’র অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ও সাপ্তাহিক সুসঙ্গ বার্তার সম্পাদক বিশিষ্ট কবি মো.জামাল তালুকদার।

দূর্গাপুর উপজেলার উকিল পাড়ায় হোটেল নিরিবিলিতে আমরা সবাই নাস্তা সেরে নিলাম। ৪০ মিনিটের মধ্যে সবার নাস্তা করা শেষ। নাস্তা করার পর আমরা সবাই সোমেশ^রী নদীর দিকে পদ যাত্রা করলাম। প্রচন্ড দুলাবালি যুক্ত এলাকা দূর্গাপুর। কিন্তু সকাল বেলায় দেখলাম বিশেষ করে উকিল পাড়া থেকে নদীর পাড় পর্যন্ত বালি মুক্ত। কাঁচা রাস্তা হলেও মাটি ভিজা ছিলো। হয়তো আগের দিন বৃষ্টি হয়েছে, অন্যথায় প্রশাসন পানি ছিটিয়েছে। আমাদের সাথে গাইডার হিসেবে আছেন দূর্গাপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির ইঞ্জিনিয়ার তাজুল ইসলাম। আমি তার কাছ থেকে বেশ কিছু তথ্য পেয়েছি। উনি প্রায় সময়ই আমার সাথে কাটিয়েছেন। কথা বলতে বলতে প্রায় ২০ মিনিট হাটার পর আমরা নদীর পাড়ে উপস্থিত হলাম।

নদীর তীরে পা দিতেই অজানা এক ভালো লাগায় জার্নির ক্লান্তি হাটার কষ্ট নিমেষেই দূর হয়ে গেলো। বিশাল নদী সোমেশ^রী, তবে অধিকাংশ অংশই চর অথবা শীত মৌসুমে শুকনো থাকে। মাঝখানে প্রায় ২০০ মিটার (প্রস্ত) পানির প্রবাহ আছে। এই সেই নদী যে নদী তার সৃষ্টিকর্তার অপার মেহের বানীতে প্রতিদিন টনে টনে নুড়ী পাথর উপহার দিয়ে যাচ্ছে সৃষ্টির সেরা জীবদের। পাথর আর পাথর, ছোট-বড় পাথর, নুড়ী পাথর, যে দিকে চোখ যায় শুধুই পাথর। এ যেন পাথরের রাজ্যে এসে পৌঁছলাম আমরা। নদীর পাড়ে শত শত মেশিন তেল পুড়িয়ে অনবরত পাথর উত্তোলন করে যাচ্ছে। আর সারিবদ্ধ ট্রাক সে পাথরগুলো নিয়ে যাচ্ছে গন্তেব্যে। আবার অনেককে দেখলাম বাঁশ বেত দিয়ে তৈরি তাদের নিজস্ব একটি পাত্রের মাধ্যমে নদীতে ডুব দিয়ে দিয়ে পাথর সংগ্রহ করে নৌকাতে রাখছে। অল্প অল্প করে তোলা পাথর একসময় নৌকা ভর্তি হয়ে যায়।

সে পাথর তারা মহাজনের কাছে বিক্রি করে তাদের সংসার চালায়। ইঞ্জিন চালিত বড় নৌকায় আমরা নদী পার হলাম। নদীর ওপাড়েই শীবগঞ্জ বাজার। শীবগঞ্জ আর উকিলপাড়াকে নদী পৃথক করে দিলেও দু’পাড়ের মানুষদেরকে পৃথক করা সম্ভব হয়নি। কষ্ট করে হলেও তারা নৌকায় করে নদী পারাপার হয়ে তাদের সম্পর্ক এবং প্রয়োজনীয় কাজ সারছেন। এখানে পারাপারের জন্য মাত্র দু’টি বড় নৌকা রয়েছে। স্কুল-কলেজ, মাদ্রাসা এবং প্রশাসনিক প্রায় অধিকাংশ ভবন উকিল পাড়ায় হলেও হাট বসে শীবগঞ্জে। শীবগঞ্জও পৌরসভার অংশ। উকিল পাড়া সমতল ভূমি হলেও শীবগঞ্জ উঁচু-নিচু এবং টিলায় ঘেরা। আমরা পায়ে হেটে শীবগঞ্জ বাজার পার হয়ে মেইন সড়কে উঠলাম।

এখানে আগে থেকেই আমাদের জন্য ১০টি অটো রিক্সা অপেক্ষা করছে। আমি আমার নির্ধারিত ৩নং অটোতে গিয়ে বসলাম। এবার আমাদের যাত্রা চীনা মাটির পাহাড়ে। দুই পাশেই সবুজ অরন্য। ছোট বড় বেশ কয়েকটি টিলা তারই পাদদেশে ছোট ছোট কৃষি জমি। শিবগঞ্জ বাজার থেকে পেরিয়ে এলাম কত কত মায়াবী পথ! ছায়াচ্ছন্ন পাখিডাকা সেই সব পথের দু’ধারে সবুজ শস্যসাগর। বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো একটি-দু’টি গ্রাম শস্যসাগরের মাঝে ভাসছে যেন! এসব দেখতে দেখতেই আমরা প্রবেশ করলাম বহেরাতলীতে। ছোট্ট সুন্দর এই গ্রামের শান্ত পথ ধরে কিছুক্ষণ চলার পর সচকিত হলাম হঠাৎ।

পথের বাঁ দিকে অনেকটা ফাঁকা জায়গার এক পাশে একটি নান্দনিক স্মৃতিসৌধ। সিমেন্টের তৈরি একটি অনুচ্চ বেদির ওপর প্রতিষ্ঠিত স্মৃতিসৌধটি নির্মিত হয়েছে আদিবাসীদের নিত্যব্যবহার্য ধনুকের প্রতিকৃতি অনুসরণে। গুণবাঁধা টান টান সেই ধনুকের প্রয়োগকেন্দ্র দখল করে আছে অগ্রগমনে উদ্যত একটি তীর। ঊর্ধ্বমুখী সেই তীরটি যেন নির্দেশ করছে আদিবাসী জীবনের বিশেষ কোনো স্মৃতিকে, বিশেষ কোনো আত্মত্যাগকে! সেই বিশেষ স্মৃতির সঙ্গে কিংবা সেই বিশেষ আত্মত্যাগের সঙ্গে জড়িয়ে আছে রাশিমনি হাজংয়ের।

রাশিমনি হাজং। সুবিখ্যাত টংক আন্দোলনের প্রথম শহীদ তিনি। তাঁরই স্মৃতিসৌধ এটি। বহু পঠিত অতীতের বর্ণোজ্জ্বল ঘটনাগুলো ভাবতে চেষ্টা করলাম বহেরাতলীর বহমান বর্তমান স্পর্শ করে। হ্যাঁ, বিরিশিরি থেকে মাইল চারেক উত্তরে আদিবাসী অধ্যুষিত গ্রাম বহেরাতলীতে জন্মেছিলেন বিপ্লবী নারী রাশিমনি হাজং। বগাঝড়া গ্রামের পাঞ্জী হাজংয়ের সঙ্গে বিয়ে হয় তাঁর। বিয়ের পর নিঃসন্তান এই দম্পতি বাস করতে থাকেন বহেরাতলী গ্রামেই।

‘টংক’ মানে ধান কড়ারি খাজনা। জমিতে ফসল হোক বা না হোক, নির্দিষ্ট পরিমাণ ধান খাজনা হিসেবে দিতেই হবে। ‘টংক’ স্থানীয় নাম। এই প্রথা চুক্তিবর্গা, ফুরন প্রভৃতি নামে ওই সময় বিভিন্ন স্থানে প্রচলিত ছিল। কলমাকান্দা, দুর্গাপুর, হালুয়াঘাট, নালিতাবাড়ী, শ্রীবর্দী থানায় বিশেষ করে সুসং জমিদারি এলাকায় এর প্রচলন ছিল ব্যাপক। টংক ব্যবস্থায় সোয়া একর জমির জন্য বছরে ধান দিতে হতো সাত থেকে পনেরো মণ। ধানের দর হিসেবে প্রতি সোয়া একরে বাড়তি খাজনা দিতে হতো এগারো থেকে প্রায় সতেরো টাকা, যা ছিল এক জঘন্যতম শোষণ। এ ছাড়া টংক জমির ওপরও কৃষকদের কোনো মালিকানা ছিল না। ফলে এই শোষণের বিরুদ্ধেই ঐক্যবদ্ধ হতে থাকেন কৃষকরা।

এই আন্দোলনের নেতৃত্বে ছিলেন সুসং-দুর্গাপুরের জমিদার সন্তান কমিউনিস্ট পার্টির নেতা মণি সিংহ। টংক আন্দোলন চলছে পুরোদমে। আন্দোলনকারীদের দমাতে ময়মনসিংহ থেকে সশস্ত্র পুলিশের দল আসে দুর্গাপুরে। বিরিশিরিতে তারা একটি সশস্ত্র ঘাঁটি গড়ে।

১৯৪৫ সাল। দ্বিতীয় মহাসমর শেষে টংক আন্দোলন দ্বিতীয় দফায় দানা বাঁধতে শুরু করেছে নেত্রকোনা জেলার দুর্গাপুর অঞ্চলে। সে সময় টংকের আয়ের ওপর নির্ভরশীল ছিল এলাকার জমিদারদের জীবনযাপন। টংকের আদায় থেকেই ব্রিটিশ সরকারকে রাজস্ব দিতেন তাঁরা।

কমরেড মণি সিংহের নেতৃত্বে দুর্গাপুরের কৃষকেরা যখন টংক প্রথার বিরুদ্ধে পুনরায় রুখে দাঁড়ানোর পরিকল্পনা শুরু করলেন, চিন্তিত জমিদারেরা তখন বিষয়টিকে ব্রিটিশ সরকারের নজরে আনার চেষ্টা করলেন। কিন্তু সরকারের নজরে আসার আগেই আন্দোলন বেশ জোরদার রূপ লাভ করল দুর্গাপুরে। হাজং নেতা ললিত সরকার, রামনাথ হাজং, পরেশচন্দ্র হাজং, বিপিন হাজং ও মঙ্গল সরকারের নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ হলেন কৃষকেরা।

রাশিমনি, সুরূপা, ভদ্রমনি, সমাপতী, বিপুলা, মালতী, যাদুমনিসহ তিন শতাধিক হাজং নারীর বিপ্লবী প্রচেষ্টায় সংগঠিত হলেন সাধারণ নারীরাও। সুসং দুর্গাপুর হাইস্কুল মাঠে দ্বিতীয় দফা টংক প্রথা উচ্ছেদের প্রস্তুতি সভা সমাপনের পর টনক নড়ল প্রশাসনের। ১৯৪৬ সালের ১ জানুয়ারি দুর্গাপুরের বিরিশিরিতে একজন ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে স্থাপন করা হলো ইস্টার্ন ফ্রন্টিয়ার রাইফেল বাহিনীর সশস্ত্র ক্যাম্প।

এই বাহিনীর সদস্যরা টংক আন্দোলনকারীদের দমনের উদ্দেশ্যে দুর্গাপুরের বিভিন্ন গ্রামে হানা দিতে শুরু করল। এরই অংশ হিসেবে ৩১ জানুয়ারি সকাল ১০টায় তারা পৌঁছাল বহেরাতলী আদিবাসী গ্রামে। তন্নতন্ন করে গ্রাম তল্লাশির পরও টংক আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত ইসলামাশ্বর হাজং, গজেন্দ্র হাজং ও লংকেশ্বর হাজংকে না পেয়ে শেষ পর্যন্ত লংকেশ্বর হাজংয়ের সদ্য বিবাহিত স্ত্রী কুমুদিনী হাজংকে ধরে বিরিশিরি ক্যাম্পের দিকে রওনা হলো সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরা। এই খবর আশপাশের হাজং গ্রামগুলোতে ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই দ্রুত জড়ো হলো গ্রামের হাজং অধিবাসীরা।

রাশিমনি হাজং ও সুরেন্দ্র হাজংয়ের নেতৃত্বে সশস্ত্র বাহিনীর পথ রোধ করে দাঁড়াল তারা। দৃঢ়কণ্ঠে কুমুদিনীকে ছেড়ে দেওয়ার দাবি জানাল মারমুখী হাজং জনতা। কিন্তু হাজংদের বক্তব্যে কর্ণপাত করল না সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরা। কুমুদিনীকে নিয়ে তারা ক্যাম্পের দিকে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করল। কিন্তু রাশিমনি, দিস্তামনি, রণেবালা হাজংসহ আনুমানিক ১২ জন নারী বাধা দিলেন তাদের। কুমুদিনী হাজংকে মুক্ত করার চেষ্টা করলেন প্রাণপণে। হাজং নারীদের এই প্রাণপণ চেষ্টায় ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেল সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের।

রাইফেল তাক করে নৃশংসভাবে গুলি চালাল তারা হাজং জনতার ওপর। জনতার পুরোভাগে থাকা রাশিমনি হাজং শহীদ হলেন প্রথম গুলিতেই। সুরেন্দ্র হাজং রাশিমনির নিষ্প্রাণ দেহ কোলে তুলে নিতে চাইলে গুলিতে বিদীর্ণ হলো সুরেন্দ্রর বক্ষও। এবার আর হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকল না ক্ষিপ্ত হাজংরা। ঝড়ের বেগে তারা ঝাঁপিয়ে পড়ল সেনাদের ওপর। হাতাহাতির পাশাপাশি দেশীয় অস্ত্রও ব্যবহার করল তারা। ধনুকের সাহায্যে তীর ছুড়ল অবিশ্রান্ত। বল্লমের আঘাতে হত্যা করল দু’জন সেনাসদস্যকে।

তারপর কুমুদিনী হাজংকে মুক্ত করে সরে পড়ল দ্রুত। স্বল্প পরিসরের সেই যুদ্ধজয়ের পর থেকেই হাজংদের অধিকার আদায় ও নারী সংগ্রামের প্রতীক হয়ে ওঠেন রাশিমনি। ব্যক্তিজীবনে নিঃসন্তান হয়েও হাজং স¤প্রদায়ের কাছে তিনি পরিগণিত হন হাজংমাতা হিসেবে। তারই স্মৃতির স্বাক্ষর এই স্মৃতিসৌধ।

রাশিমণি স্মৃতিসৌধ থেকে প্রায় দেড় কিলোমিটার দূরে বিজয়পুরে চীনা মাটির পাহাড়। প্রকৃতির কত রং, কত রূপ! গাঢ় নীল আকাশ আর গাছগাছালির অপার সবুজের সাথে সবাই পরিচিত। কিন্তু এই চেনা পরিচিত পৃথিবীর বাইরে প্রকৃতি যখন নিজের লুকায়িত রূপ সাজিয়ে বসে, তার ডাকে সাড়া না দিয়ে থাকা যায় না। মেটে রঙ ছাড়াও মাটির যে আরও কত রং থাকতে পারে, তা দেখার আগ্রহ জাগবে প্রকৃতিপ্রেমী যে কোনো মানুষের।

নেত্রকোনা জেলার দুর্গাপুর উপজেলার বিজয়পুর ইউনিয়নের আড়াপাড়া গ্রামটি এককালে ছিল লোকচক্ষুর অন্তরালে। তখন বহিরাগতদের পা পড়ত না বললেই চলে। স্থানীয়দের বসতিও খুব বেশি ছিল না। এখানে ছিল বন্য প্রাণীর অভয়ারণ্য। স্থানীয় অধিবাসীরা বাজার কিংবা অন্য কাজে শহরে যেত মাইলের পর মাইল পায়ে হেঁটে। এদেশের উল্লেখযোগ্য সম্পদ বিজয়পুরের সাদামাটি বা হোয়াইট ক্লে।

১৯৫৭ সালে দুর্গাপুরে সর্বপ্রথম সাদা মাটির সন্ধান পাওয়া গেলে পরবর্তী বছরগুলোতে সরকারের খনিজ সম্পদ বিভাগ এ সাদামাটির পরিমাণ নির্ধারণের জন্য ১৩টি কূপ খনন করে। ফলে এই এলাকায় পাওয়া যায় নিয়মিত ও অনিয়মিত স্তরের সাদামাটি। বিজয়পুরের সাদামাটিই বাংলাদেশের চাহিদার বেশিরভাগ পূরণ করে চলেছে। বাংলাদেশের সিরামিক ইন্ডাস্ট্রিজ এ মাটি ব্যবহার করে তৈজসপত্র তৈরি করে।

চীনে এ মাটির সর্বপ্রথম ব্যবহার শুরু হয়েছিল বলে অনেকেই সাদামাটিকে চীনা মাটিও বলে থাকে। সেই থেকেই মুখে মুখে এই এলাকার নাম হয়ে যায় বিজয়পুর সাদামাটি কিংবা চীনা মাটির পাহাড়। সাদামাটি বলা হলেও আদতে এর রং হালকা ধূসর থেকে সাদাটে রঙের। কোনো কোনো জায়গায় আরও কয়েকটি রঙের সমন্বয় রয়েছে। কোথাও গোলাপি, কোথাও রংচটা লাল। তাই আবার জায়গাটিকে লাল কিংবা গোলাপি মাটির পাহাড় নামেও চেনে অনেকে।

চীনা মাটির এই পাহাড়ের সন্ধান পাওয়ার পর সরকার এখানে কোয়েরি করে। তখনই এই পাহাড়ের পাদদেশে তৈরি হয় হ্রদ৷ আশ্চর্যের ব্যাপার হলো হ্রদের পানি নীলাভ সবুজ। কেবল সবুজ নয়। বছরের কিছু বিশেষ সময়ে পানি নীল রঙেরও থাকে৷ বৃষ্টি না হলেই নাকি পানি নীল থাকে। এখন আর খুব বেশি নীলরঙা পানি দেখা না গেলেও একসময় গাঢ় নীলই দেখাত এই হ্রদের পানি। এমনকি আগে লাল রঙা পানিও দেখা যেত। হরেক রকম রঙের সমন্বয়ের কারণেই ভ্রমণপিয়াসু মানুষের কাছে এই জায়গাটি জনপ্রিয়তা পায়। গোলাপি সাদা রঙের পাহাড়, আর তার নিচে নীলাভ সবুজ জলাধার, উপরে নীল আকাশ এক অপূর্ব মাধুর্যের সমন্বয় সাধন করেছে এখানে প্রকৃতি।

অনেকেই জায়গাটিকে বিরিশিরি নামে চেনেন। কিন্তু সত্যি বলতে, বিরিশিরি নামে এখানে কোনো পর্যটন কেন্দ্র তো দূরে থাক, কোনো গ্রামের নামও নেই। এটি কেবল একটি বাসস্ট্যান্ডের নাম। স্থানীয়রা এই জায়গাটিকে সাদা মাটি, নীল পানি, চীনা মাটির পাহাড় নামেই চেনে।

অটো থেকে নেমেই সামনে গোলাপী পাহাড় চোখে পড়ল। পাহাড়ের পাদদেশে নীলাভ পানির লেক। অপর পাশেই সাদা পাহাড়। হঠাৎ করে এমন প্রকৃতি দেখে তনু-মন নেচে উঠলো। জামান আর সামাদ নিজেদেরকে ধরে রাখতে পারলোনা। দ্রুততম সময়ে তারা কাটা পাহাড়ের কিছুটা উপরে উঠে গেল। বেলা চড়ছে। সূর্যমামা নিজের সমস্ত তাপ আলো ছড়িয়ে দিচ্ছে চরাচরে। এখানকার পাহাড়গুলো তেমন উঁচু নয়। তবে পাশ্ববর্তী দেশ ভারতের মেঘালয় রাজ্যের বিশাল বিশাল পাহাড়গুলো দেখা যায় চিনা মাটির পাহাড়ের চূড়ায় উঠলে। বেশ কয়েকটি দলে ভিবক্ত হয়ে আমাদের ভ্রমণ টিম ঘুরছে। আমি আর সামাদ ঘুরছি আর ছবি তুলছি।

এক পাহাড় থেকে আরেক পাহাড়। আবার কখনো সমতল ভূমি, কখনো লেক। হাটতে হাটতে কিছু দূর লেকের পাশে একটা জটলা চোখে পড়লো। কাছে গিয়ে দেখতে ফেলাম একটি গানের সুটিং চলছে। বিশাল একটি টিম, বিশাল আয়োজন। তবে শুধুমাত্র নায়ক বাপ্পী চৌধুরীকে ছাড়া আর কাউকেউই চিনলাম না। এখানে মজার একটি তাজা গল্প আছে। লেকের পাশেই সুটিং চলছে, তার পিছনেই পাহাড়। পাহাড়ের উপর কয়েকজন পর্যটক। এ পর্যটকদের জন্য ক্যামরামেনদের দৃশ্য ধারণ করতে সমস্যা হচ্ছে। তাই ডিরেক্টর টাইফের একজন হ্যান্ড মাইক নিয়ে পাহাড়ে অবস্থিত সবাইকে সরে যাওয়ার জন্য অনুরোধ করেন। পাহাড় থেকে জবাব এলো,‘আপনারা একটু পরে করেন। আমরা অনেক দূর থেকে এসেছি। এখানে ১০ মিনিট থাকবো।’ তাদের জবাব শুনে ঘোষক একেবারেই চুপ হয়ে গেলেন।

এখানকার সবচেয়ে বড় পাহাড়ে ওঠার আগে শক্তি সঞ্চয় করা চাই। তাই ডাবওয়ালাকে ডাব কেটে দিতে বললাম। পানি পান করে পা বাড়ালাম পাহাড় অভিমুখে। প্রচুর মানুষ থাকলেও আমরা আরামেই শান্তিপূর্ণভাবে পাহাড়ে উঠলাম। যদিও নামতে আমার কিছুটা সমস্যা হচ্ছিল। খুব ভয় পেয়েছিলাম যদি পা ফসকে………..। উপর থেকে গ্রামটা ভীষণ সুন্দর লাগছে। কিন্তু চীনামাটির পাহাড় আর নীলরঙা হ্রদটা কই? ৩৬০ ডিগ্রি ঘুরে সামনে উপত্যকা আর ছোট টিলা পেলাম৷ আর দূরে একচিলতে নীলচে সবুজ পানি। কোনো কোনো স্থান মসৃণ, কোথাও খসখসে। কোথাও গাঢ় গোলাপি রাঙা মাটি। কোথাও মাটির রং একটু ময়লা সাদা। শুকনো এ সাদা মাটি শক্ত ও ভঙ্গুর। বোঝাই যাচ্ছে ভেজালে আঠালো ও নরম হয়ে যায়। বর্ষায় এলে এই পাহাড়ে চড়ে ঘুরে দেখতে হলে খুবই বিপদে পড়তে হবে। পাহাড়ের চূড়ায় স্থানীয় কয়েকজন তাদের অস্থায়ী দোকানে পণ্যের পসরা সাজিয়ে বসে আছে। এক পাশে ছোট একটি ছেলে খিরাই বিক্রি করছে। আমরা খিরা খেয়ে মন ও শরীরকে সিক্ত করলাম।

ঢাল বেয়ে নিচে নেমে দেখি দূরেরটা ছাড়াও আরও একটি হ্রদ আছে। এখানে হ্রদটি যে পাহাড়ের গায়ে শুয়ে আছে সেটিও গোলাপি ও সাদা রঙা। এই হ্রদটি প্রাকৃতিকভাবে তৈরি হয়নি৷ চীনামাটির এই আকর থেকে খুঁড়ে খুঁড়ে প্রাকৃতিক এই সম্পদ তোলার কারণেই তৈরি হয়েছে এটি। খননকার্যের কারণে এই হ্রদ বেশ গভীর, তাই এখানে গোসলে নামা নিষেধ। এই পাহাড়টি শক্ত রঙিন শিলা দিয়ে তৈরি৷ বেশ রুক্ষ, তবুও খুব সুন্দর। হ্রদের সবুজ জলে সাদা চিনামাটির পাহাড়ের প্রতিবিম্ব যেন এক অলৌকিক সৌন্দর্য তৈরি করে।

বাংলাদেশের মধ্যে প্রকৃতির সম্পদ হিসেবে সাদা মাটির অন্যতম বৃহৎখনিজ অঞ্চল এটি। ছোট বড় টিলা-পাহাড় ও সমতল ভূমি জুড়ে প্রায় ১৫.৫ কিলোমিটার দীর্ঘ ও ৬০০ মিটার প্রস্থ এই খনিজ অঞ্চল। খনিজ সম্পদ উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী ১৯৫৭ সালে এই অঞ্চলে সাদামাটির পরিমাণ ধরা হয় ২৪ লক্ষ ৭০ হাজার মেট্রিক টন, যা বাংলাদেশের ৩ শত বৎসরের চাহিদা পুরণ করতে পারে।

সেখান থেকে আমরা চলে আসলাম রাণীখং মিশনে। আগেই অনুমতি নেওয়ায় আমরা প্রবেশ করতে পেরছি। আমরা দেখলাম অনেক পর্যটককেই সেখানে ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না। দূর্গাপুর উপজেলা পরিষদ থেকে ৬ কিলোমিটার উত্তরে কাল্লাগড়া ইউনিয়নের উত্তর পূর্ব সীমান্তে সোমেশ্বরী নদীর কোল ঘেঁষেই পুরো মিশনটি। এটি একটি উচু পাহাড়ে অবস্থিত। ১৯১০ সালে রাণীখং মিশনটি স্থাপিত হয়। এটা খ্রীষ্টিয় ক্যাথলিক ধর্মপল্লী। ক্যাথলিক স¤প্রদায়ের একটি উপাসনালয়। সুরম্য একটি গীর্জাসহ এখানে একটি দাতব্য চিকিৎসালয়, দু’টি স্কুল ও একটি পোষ্ট অফিস আছে।

এছাড়া সিস্টারদের আবাসন, সোমেশ্বরী নদীর উপর ‘শান্তি কুটির’ নামে একটি ঝুলন্ত হাওয়া খানা, ফাদারের আবাসন, ছাত্র ও ছাত্রীদের জন্য আলাদা নিবাস রয়েছে। তবে ফাদার ও সিস্টারদের আবাসন এবং ছাত্র-ছাত্রী নিবাসে প্রবেশাধিকার একেবারের সংরক্ষিত। মিশনটির মূল প্রবেশপথ ধরে কিছুদূর এগোলেই চোখে পরবে একটা ভাস্কর্যের। প্রার্থনারত এই ভাস্কর্যটার পাশেই আছে সাধু যোসেফের গির্জা। গারো স¤প্রদায়ের শতভাগ খ্রিস্টধর্ম গ্রহণের কৃতিত্ব এককভাবে এই রানীখং মিশনের। এছাড়া মিশনের ভিতরে শান্তিনিকেতন নামে একটি বিশ্রামাগার আছে, যেখান থেকে প্রকৃতিকে আরো নিবিড়ভাবে উপভোগ করা যায়।

রাণীখং নামকরণ নিয়ে কিংবদন্তী আছে যে, এ অঞ্চলে ‘খং-রাণী’ নামে এক রাক্ষস বাস করত। গারো আদিবাসীরা এই রাক্ষসটিকে হত্যা করে এ অঞ্চলে শান্তি এনেছিল। যার ফলে এই অঞ্চলের নাম হয়েছিল রাণীখং। রানীখং নামক স্থানে প্রতিষ্ঠিত বলে এ মিশনটির নাম রানীখং মিশন। প্রকৃতির অপরুপ লীলাভূমি রাণীখং মিশন। মিশনটির সম্মুখে বিস্তির্ণ সাদা সিলিকা বালি। ছোট বড় সারি সারি টিলা-পাহাড় মিশে গেছে দিগন্ত জুড়ে। পা বাড়ালেই ভারতের মেঘালয় রাজ্য।

এখান থেকেই উপভোগ করা যায় পাহাড় আর মেঘের লুকোচুরি খেলা আর নীলিমায় ভেসে যাওয়া বনবিহার। পাহাড় চুড়ায় গড়ে উঠা মিশনটির পূর্ব পার্শ্ব দিয়ে বয়ে গেছে খর¯্রােতা পাহাড়ী নদী ‘সোমেশ্বরী’। নদীর নীল, স্বচ্ছ আর শীতল পানি ক্ষণিকের জন্য আপনাকে এনে দিবে প্রশান্তি। নদীর ওপারে আছে বালুর চর, চাইলে নদী পার হয়ে কিছু মুহূর্ত ওখানেও কাটিয়ে আসতে পারেন।

এখান থেকে বের হয়ে আমরা কমলা পাহাড় টিলায় গেলাম। প্রকৃতির সাথে কিছু সময় অতিবাহিত করে আমরা জুমার নামাজ আদায় করতে চলে আসলাম নেত্রকোণা ব্যাটালিয়ন (৩১ বিজিবি), বিজয়পুর সীমান্ত পাড়ীতে। এখানে ছোট্ট একটি মসজিদ রয়েছে। পাশেই সোমেশ^রী। নামাজ শেষে আমি, জামান, সামাদ ও মনির ভাই একটি নৌকা ভাড়া করে সোমেশ^রীতে নেমে পড়লাম। নদীর জল আয়নার মুখে মুখ লাগিয়ে যেন স্বচ্ছতার কথা কয় সারাবেলা। ভারতের মেঘালয় রাজ্যের গারো পাহাড়ের বিঞ্চুরীছড়া, বাঙাছড়া প্রভৃতি ঝর্ণাধারা ও পশ্চিম দিক থেকে ‘রমফা’ নদীর স্রোতধারা একত্রিত হয়ে সোমেশ্বরী নদীর সৃষ্টি।

৬৮৬ বঙ্গাব্দের মাঘ মাসে সোমেশ্বর পাঠক নামে এক সিদ্ধপুরুষ অত্র অঞ্চলকে বাইশা গারো নামের এক অত্যাচারী গারো শাসক এর হাত থেকে মুক্ত করে নেয়ার পর থেকে নদীটি সোমেশ্বরী নামে পরিচিতি পায়। মেঘালয় রাজ্যের বাঘমারা বাজার (পূর্ব নাম বঙ বাজার) হয়ে বাংলাদেশের রাণীখং পাহাড়ের কাছ দিয়ে সোমেশ্বরী বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। নদীটি রাণীখং পাহাড়ের পাশ বেয়ে দক্ষিণ দিক বরাবর শিবগঞ্জ বাজারের কাছ দিয়ে সোজা পূর্ব দিকে প্রবাহিত হয়। সেই পথে কুমুদগঞ্জ বাজার হয়ে কোনাপাড়া গ্রামের আব্দুল জলিল তালুকদার সাহেবের বাড়ির সামনে দিয়ে প্রবাহিত হয়ে বাকলজোড়া, সিধলি, কলমাকান্দা, মধ্যনগর হয়ে ধনু নদীর সঙ্গে মিলিত হয়েছে সোমেশ্বরী। সোমেশ্বরীর মূলধারা তার উৎসস্থলে প্রায় বিলুপ্ত।

১৯৬২ খ্রিস্টাব্দে পাহাড়ী ঢলে সোমেশ্বরী বরাবর দক্ষিণ দিকে প্রবাহিত হয়ে নতুন গতিপথের সৃষ্টি করেছে। যা স্থানীয় ভাবে শিবগঞ্জ ঢালা নামে খ্যাত। বর্তমানে এ ধারাটি সোমেশ্বরীর মূল স্রোতধারা। এ স্রোতধারাটি চৈতালি হাওর হয়ে জারিয়া-ঝাঞ্জাইল বাজারের পশ্চিমদিক দিয়ে কংশ নদীর সঙ্গে মিলিত হয়েছে। ১৯৮৮ সালে পাহাড়ী ঢলে ‘আত্রাখালি’ নদী নামে সোমেশ্বরী নদীর আরো একটি শাখা সৃষ্টি হয়। সুসঙ্গ দুর্গাপুর বাজারের উত্তর দিক দিয়ে সোমেশ্বরী নদী থেকে পূর্বদিকে প্রবাহিত হয়েছে ‘আত্রাখালী’। এটি কিছু দূর এগিয়ে সোমেশ্বরীর মূলধারা সঙ্গে যুক্ত হয়েছে । ২০১৪ সালের ভয়াবহ বন্যার পর আত্রাখালি থেকে নয়া গাঙ নামের আর একটি স্রোত ধারা উত্তর দিকে সৃষ্টি হয়েছে। আরো ভাটিতে সোমেশ্বরীর শাখা নদীর সৃষ্টি হয়েছে গুনাই, বালিয়া ও খারপাই।

সোমেশ্বরী নদী বাংলাদেশ-ভারতের একটি আন্তঃসীমান্ত নদী। এটি ভারতের মেঘালয়ের পশ্চিম গারো পাহাড় জেলা এবং বাংলাদেশের নেত্রকোণা জেলায় প্রাবাহিত একটি নদী। নদীটির দৈর্ঘ্য ৫০ কিলোমিটার, গড় প্রস্থ ১১৪ মিটার এবং নদীটির প্রকৃতি সর্পিলাকার। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড বা ‘পাউবো’ কর্তৃক সোমেশ্বরী নদীর প্রদত্ত পরিচিতি নম্বর উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নদী নং ৮৫। সোমেশ্বরী নদী এক সময় সিমসাং নামে পরিচিত ছিল।

আপনার মন কী বিষন্ন? পরপর কয়েকটি খারাপ খবরে মন খুব খারাপ, কাজ করতে কারতে হাফিয়ে উঠেছেন, ক্লান্ত দেহকে সতেজতায় ভরে দিতে চান? তাহলে ঘুরে আসুন পাহাড় নদী গাছ-গাছালিঘেরা আদিবাসী অধ্যুষিত নেত্রকোণার দূর্গাপুর! বাজি রেখে বলতে পারি, গারোদের দেশে পা ফেলতেই আপনার মন প্রফুল্ল হয়ে উঠবে। কবি হয়ে কেউ লিখে ফেলবেন কবিতা, কেউবা গলা ছেড়ে গাইবেন গান। আর যারা প্রকৃতির এই বিপুল সৌন্দর্যের এক মুঠো সন্দেশ হিসেবে নিতে চান তারা যে সেলফি আর স্ন্যাপ শটে মগ্ন হয়ে যাবেন-এতে কোনও ভুল নেই।
বর্ষাকালে থৈ থৈ পানিতে টইটম্বুর থাকে সোমেশ্বরী নদী কিন্তু এখন ফাল্গুন; শীত পুরোপুরি বিদায় নেয়নি। শুকনো মৌসুম, তাই সোমেশ্বরীতে তেমন স্রোত নেই, পানিও কম। পানি এতোই স্বচ্ছ যে, নদীর তলদেশ দেখা যায়। মনে হয় হাতের স্পর্শে সেখানে যাবে কিন্তু না, কোমর পানি হবে নদীতে। উপরে পানির ¯্রােত, নীচে নুড়ী পাথরের স্রোত। এক পাশে বাংলাদেশ আরেক পাশে ভারত। এ যেন পরম মমতায় দুই সন্তানকে আগলে রেখেছে সোমেশ্বরী। দুই পাশে পাহাড় আর সবুজ দিগন্ত। মাঝখানে স্বচ্ছ পানির ধারা বয়ে যাচ্ছে নিরবধি। চারদিকে নির্মল বাতাসে। অসম্ভব ভালোলাগাময় একটি পরিবেশ।

হৃদয়ভরে প্রশান্তির শ্বাস নেওয়া এরকম পরিবেশ খুব কমই দেখা যায়। জাগতিক সব চিন্তাশক্তিকে অবস করে দিয়ে মন এবং মস্তিষ্ককে একেবারে শূণ্য করে দেয় এমন পরিবেশ। মনির ভাইয়ের বেসূরা গলাও এখন ভালো লাগছে। সবকিছু ভালো লাগে। জগতের সকল অসুন্দর সোমেশ^রীর জলধারায় ধূয়ে পরিচ্ছন্ন করে দেয়। নিজের অজান্তে মনির ভাইয়ের সাথে আমরাও গান ধরলাম। আমাদের সুরের সাথে সুর মিলিয়ে নদীতে মাছ ধরতে থাকা গোটা দশেক জেলেও গান ধরলো। ৫/৬ জনের একটি টিম নৌকায় করে আমাদের পাশ দিয়ে যাচ্ছিল, তারাও আমাদের সাথে সুর মিলালো।

মাঝি এক স্থানে এসে থেমে গেল, সামনে আর যেতে চায় না। জানতে চাইলে বললো- এটা বাংলাদেশের শেষ সিমানা। সামনে আর যাওয়া যাবে না। মাঝিকে অনেক অনুরোধ করে আরো একটু ভিতরে গেলাম। মানে ভারতের সীমান্তে ঢুকে পড়েছি। মাফ করে দিও ভারতের প্রশাসন। তোমাদের অনুমতি না নিয়েই তোমাদের রাজ্যে প্রবেশ করেছি। মনকিছুটা খারাপ হলো। মানুষ কেন ভৌগোলিক সীমানা নির্ধারণ করবে? কেন এক ভূখন্ড থেকে আরেক ভূখন্ডে যেতে ভিসা, পাসপোট লাগবে? কেন মানুষ প্রকৃতির বিরুদ্ধে অবস্থান করছে? এই যে নদী, ভারত থেকে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে; তার কী ভিসা পাসপোর্ট লেগেছে? তাকে কি আটকিয়ে রাখা গেছে? এই যে পাখি গুলোা; স্বাধীন মতো এক আকাশের নিচে স্বাধীন মতো ঘুরে বেড়াচ্ছে, তার তো ভিসা পাসপোর্ট লাগেনি! তাহলে মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব হয়ে কেন এতো সব পর্মালিটি মানতে হবে? কেন ১নং জীব হয়ে ২ নাম্বার কার্য কলাপ? কবে বন্ধ হবে অমানুষ সুলভ এসব কর্মকান্ড? জানি সৃষ্টির ঊষালগ্ন থেকে একটা সময় এসবের কিছুই ছিলো না। মানুষই এসবের প্রচলন করেছে। জানি, একদিন এসবের কিছুই ছিলো না। এটাও জানি আবার এমনদিন আসবে যেদিন এসবের কিছুই থাকেব না। সবাই মানুষ হবে। ভৌগোলিক দূরত্বে মানুষের দূরত্ব বাড়াতে পারবে না।

যারা নেত্রকোনায় আসবেন তারা দূর্গাপুর উপজেলার কমলা রাণীর দীঘি, গারো পাহাড়, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী সাংস্কৃতিক একাডেমি, সুসং দুর্গাপুরের জমিদার বাড়ি, টংক আন্দোলনের স্মৃতিসৌধ ঘুরে উপভোগ করবেন। ১৯৪৬-৫০ সালে মণিসিংহের নেতৃত্বে পরিচালিত টংক আন্দোলনে শহীদদের স্মরণে নির্মিত হয়েছে স্মৃতিসৌধ। সোমেশ্বরী নদী পার হয়ে কিছু দূর এগুলেই এম.কে.সি.এম হাই স্কুল এর পাশেই চোখে পড়বে এ স্মৃতিসৌধটি। প্রতিবছর ৩১ ডিসেম্বর মণিসিংহের মৃত্যু দিবসে এখানে সাত দিনব্যাপী মণি মেলা নামে লোকজ মেলার আয়োজন করা হয়। সুসং দুর্গাপুর এলে অবশ্যই ঘুরে যাবেন ভবানীপুর, বাদামবাড়ি, ডাহাপাড়ার গারো পাহাড়ে। দুর্গাপুর বাজার থেকে আত্রাখালি নদী পার হয়ে মাত্র ১ কিলোমিটার দূরত্বে অবস্থিত। সৃষ্টিকর্তা যেন তাঁর কুদরতি হাতে সাজিয়েছেন দূর্গাপুরকে।

গারো পাহাড়ের পাদদেশের এই উপজেলায় আদিবাসীদেরই বেশি বসবাস। বাঙালিদের পাশাপাশি তারা তাদের নিজস্ব সংস্কৃতিকে আঁকড়ে ধরে মাথা উঁচু করে বেঁচে আছে বহুকাল ধরে। গারো পাহাড়ের এই আদিবাসীদের সংস্কৃতিকে টিকিয়ে রাখতে স্থাপিত হয় ক্ষুদ্র-নৃ গোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক একাডেমি। যেখানে তারা তাদের সংস্কৃতি চর্চা করে। তাদের সংস্কৃতি চর্চায় অতিথিদের ‘বরণ’ আনন্দ দেয় এখানে আসা পর্যটকদের। এ অঞ্চলে বসবাসকারী ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জীবন যাত্রার নানা নিদর্শন সংরক্ষিত আছে এখানে। সুসং দুর্গাপুর ও এর আশপাশের উপজেলা কলমাকান্দা, পূর্বধলা, হালুয়াঘাট এবং ধোবাউড়ায় রয়েছে গারো, হাজং, কোচ, ডালু, বানাই প্রভৃতি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর বসবাস। এদের জীবন ধারা যেমন বৈচিত্রময়, তেমনি তাদের সংস্কৃতিও। এসব ঐতিহ্যকে সংরক্ষণ, উন্নয়ন এবং চর্চার জন্যই ১৯৭৭ সালে সুসং দুর্গাপুরে সরকারি উদ্যোগে গড়ে তোলা হয় ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী সাংস্কৃতিক একাডেমি। এখানে প্রায় সারা বছরই নিয়মিত অনুষ্ঠিত হয় বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।

লেখক পরিচিতি : লেখক ও সাংবাদিক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


সংবাদ পড়তে লাইক দিন ফেসবুক পেজে