September 30, 2020, 5:49 pm


ইকরাম চৌধুরীর সাংবাদিকতা:মো. আবুল হোসেন

যতদূর মনে পড়ে ১৯৯৯ সালের জুন মাসের প্রথম দিকে একদিন দুপুর বেলায় ইকরাম চৌধুরীর সাথে দেখা হলো কচুয়া পৌরসভার পশ্চিম পাশে রাস্তার উপর। সম্ভবত সংবাদ সংগ্রহ শেষে চাঁদপুর ফিরে যাচ্ছিলেন। প্রচন্ড খরতাপে হাফিয়ে উঠছিলেন। ঘামে ভিজে গেছে সমস্ত শরীর। কপালে বেয়ে ঝরছিলো ঘাম। আমাকে দেখা মাত্রই সালাম দিয়ে বলে উঠলেন, আমি যাকে চেয়েছি, তাকে আমি পেয়েছি। আমার ডান হাত ধরে নিয়ে গেলেন পাশের একটি কফি হাউজে। ঠান্ডা পানীয় পান শেষে বলতে লাগলেন, সাচার থেকে রওনা হয়ে ভাবতে শুরু করেছি আপনাকে কোথায় পাবো। সৌভাগ্য, আপনাকে পেয়ে গেলাম। শীঘ্রই আমি দৈনিক চাঁদপুর দর্পণ নামে পত্রিকা বের করতে চাচ্ছি। আপনাকে আমার পত্রিকায় কাজ করতে হবে। কোন প্রকার আপত্তি শুনবো না। বয়সে ছোট হলেও দৃঢ়চেতা ও উত্তম ব্যক্তিত্বের অধিকারী ইকরাম ইসলাম চৌধুরীর প্রতি ছিলাম খুবই শ্রদ্ধাশীল। বয়সের মাপে নয় কর্মদক্ষতা ও বিবিধ গুণাবলীর দিক থেকে তিনি ছিলেন আমার অন্তর আত্মার বড়। তাঁর কথা বলার পর নিরুৎসাহিত হবেন এমন কথা বলার সাহস খুঁজে পাইনি। সেদিন থেকেই সম্পৃক্ত হয়ে গেলাম চাঁদপুর দর্পণের সাথে। হাটি হাটি পা পা করে চাঁদপুর দর্পণ প্রকাশনার ২১টি বছর কেটে গেল।

দৈনিক রূপসী চাঁদপুর এ কাজ করার সুবাদে ইকরাম চৌধুরীর সাথে পরিচয় ঘটে ১৯৮৬ সাল থেকে । ওই সময় চাঁদপুরের কৃতিসন্তান দৈনিক যুগান্তরের বিশেষ প্রতিনিধি সাংবাদিক হেলাল উদ্দীনের সাথে পরিচয় ঘটে। হেলাল উদ্দীন দূর্নীতির বিরুদ্বে অসীম সাহসীকতা নিয়ে সংবাদ পরিবেশন করতেন। দূর্নীতির বিরুদ্বে সাহসের সাথে সংবাদ পরিবেশনে তিনি আমাদেরকওে উৎসাহিত করতেন। আমি ও ইকরাম চৌধুরী তার অনুপ্রেরনায় অনুপ্রানিত হয়ে ভয়ভীতি উপেক্ষা করে দূর্নীতি মূলক সংবাদ পরিবেশনে অধিকতর মনোযোগী হই।

দীর্ঘ ৩৫/৩৬ বছরে ইকরাম চৌধুরীর ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্যে এসে তাঁর যেসব বৈশিষ্ট আমি লক্ষ্য করি তা হচ্ছে, সংবাদ সংগ্রহে ও প্রকাশনায় কোন ক্লান্তি তাকে স্পর্শ করতে পারেনি। প্রাণোচ্ছলতা নিয়ে নিরন্তর কাজ করেছেন। সাংবাদিকতার জগতে বাঁশি রাশি কাজে ডুবে থাকতে আনন্দ বোধ করতেন। কথায় বলে “এ জার্নালিস্ট ইজ দ্যা নোজ অব দ্যা সোসাইটি” এ প্রবাদের পুরো বৈশিষ্ট্যই তার মাঝে ছিল। আমার এলাকার অনেক সংবাদ আমি জানার পূর্বে তিনি জেনে ফেলতেন। রাত ১১/১২ টায় ও আমাকে ফোন দিয়ে বলতেন, আপনার এলাকার অমুক স্থানে অমুক ঘটনা ঘটেছে। এখনই সংবাদটি পাঠানোর ব্যবস্থা নিন। কোন জটিল সংবাদ সংগ্রহের বাধা-বিপত্তির মুখে পড়ে পিছু হটার চেষ্টা করেও তা পারতাম না। তাঁর দিক নির্দেশনা ও অনুপ্রেরনার সংবাদটি তথ্যবহুল করে পাঠাতেই হতো। সাংবাদিকতায় তিনি অত্যন্ত সাহসী ছিলেন। কোন অপরাধমূলক ঘটনার রহস্য উন্মোচনে নির্ভিক ছিলেন। কোনো ভয়-ভীতি মুখে দমে যেতেন না। তাঁর এসব গুণাবলীর কারণেই তিনি জাতীয় পর্যায়ের সাংবাদিকদের নজর কেড়ে নিতে সক্ষম হন। তিনি কোন কাজের রেগে গেলে তার মাঝে একটি রুদ্ররূপ প্রকাশ পেত। আবার রাগের কারণ দূরীভূত হলে তার কোমল স্বভাব শত্রুকেও মুগ্ধ করত। সাংবাদিকতায় বড় বৈশিষ্ট্য ছিল প্রতিযোগিতামূলক মনোবৃত্তি অর্থাৎ অন্য সাংবাদিকদের সংবাদ পরিবেশনের পূর্বেই তাঁর সংবাদ পরিবেশন ও প্রকাশ হওয়া চাই। তাঁর প্রতিযোগিতামূলক মনোবৃত্তির কারণে মূলতঃ তিনি সাংবাদিকতার জগতে একটি স্থান করে নিতে পেরেছেন।

সাংবাদিকদের নিরাপত্তায় তার সাহসী ভূমিকা অনস্বীকার্য। একজন সাংবাদিক নেতা হিসেবে গড়ে উঠার সকল বৈশিষ্ট্যই তাঁর মাঝে ছিল। এর বড় দৃষ্টান্ত চাঁদপুর প্রেসক্লাবের সাংবাদিকদের মধ্যে ঐক্য প্রতিষ্ঠা। বহু গুণে গুণান্বিত এ ব্যক্তিটি আমাদের মাঝ থেকে হারিয়ে যাওয়ায় যে শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছে তা পূরণ হবার নয়। পরিশেষে কামনা তিনি জান্নাতবাসী হোন এবং তাঁর কর্ম, আদর্শ হো’ক আমাদের অনুপ্রেরণার উৎস।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


সংবাদ পড়তে লাইক দিন ফেসবুক পেজে